চন্দ্রনাথ পাহাড় ইস্যু: রাষ্ট্রীয় নীতির আড়ালে কার স্বার্থ পূরণ হচ্ছে?
সূচিপত্র
চন্দ্রনাথ পাহাড় ও রাষ্ট্রের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত
চন্দ্রনাথ পাহাড়কে ঘিরে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নিছক কোনো অসাম্প্রদায়িক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি এই কওমের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। রাষ্ট্রযন্ত্র গতকাল ঘোষণা করেছে— চন্দ্রনাথ পাহাড়কে ঘিরে কোনো “উস্কানিমূলক কার্যক্রম” দেখা দিলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেবে। শুধু তাই নয়, চন্দ্রনাথ পাহাড়কে "চন্দ্রনাথ ধাম" হিসেবেও আখ্যা দিয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, উস্কানি আসলে কারা দিচ্ছে? মুসলিমরা, যারা সারাদেশে যুগে যুগে নির্যাতন, হত্যা, ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় দমননীতির শিকার? নাকি হিন্দুত্ববাদীরা, যারা বারবার নিজেরাই নিজেদের ঘরে আগুন দিয়ে, নিজেরাই প্রতিমা ভেঙে, নিজেরাই সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে মুসলিমদের দায়ী করেছে?
ভোলা, বোরহানউদ্দিন (২০ অক্টোবর ২০১৯)
রাসূল ﷺ এর অবমাননার প্রতিবাদে মুসলিমরা রাস্তায় নেমেছিল সেদিন। কিন্তু অপরাধীকে গ্রেপ্তার না করে পুলিশ মুসলিমদের গুলি করে হত্যা করে। শহীদ হলো নবীপ্রেমিক জনতা। প্রশ্ন— কে আসল উস্কানিদাতা? রাসূল অবমাননাকারী, না প্রতিবাদী মুসলিম জনতা?
রমজান, ২০১৪
তারাবীর সালাতের সময় রথযাত্রার নাম করে মসজিদে হামলা হলো। মুসলিমরা প্রতিবাদ করলে পুলিশ তাদের ধাওয়া করে। মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা নয়, মুসলিমদের ইবাদতের পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ার পরও বরং হিন্দুত্ববাদীদের "ধর্মীয় স্বাধীনতা" রক্ষা করতে রাষ্ট্র তৎপর হলো।
সিলেট, কাজলশাহ (২০১৬)
জুমুআর সময় লাউড স্পিকারে গান চালিয়ে নামাজে ব্যাঘাত ঘটানো হলো। মুসল্লিরা প্রতিবাদ করলে মন্দির থেকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা হলো। পুলিশ মুসল্লিদের উপর টিয়ারশেল ছুঁড়ল। পরবর্তীতে খতিব-ইমামদের হত্যা করা হলো সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।
রংপুর (২০১৭)
টিটু রায় নবী অবমাননা করল। মুসলিমরা প্রতিবাদ করলে পুলিশ তাদের উপর গুলি চালাল। দিল্লির বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ বাংলার জমিনে দাঁড়িয়ে মুসলিম নিধনের হুমকি দিল প্রকাশ্যে। রাষ্ট্র তখন নীরব দর্শক!
নাসিরনগর (২৯ অক্টোবর ২০১৬)
রসরাজ দাস ফেসবুকে কাবাঘরের সাথে শিবের ছবি জুড়ে দিল। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ল। মিডিয়া দোষ চাপাল মুসলিমদের উপর। পুলিশের নির্মম আগ্রাসনের শিকার হলো প্রতিবাদরত মুসলিমরা।
প্রিয়া সাহার ভণ্ডামি (২০১৯)
নিজেই ঘরে আগুন দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে কান্নাকাটি করল— “৩৭ মিলিয়ন সংখ্যালঘু নিখোঁজ!” পরে প্রতিবেশীরা মিডিয়ায় জানাল সত্য— নাটকের পরিচালক প্রিয়া সাহা নিজেই। অথচ পশ্চিমা বিশ্বে এই মিথ্যা প্রচারণাই রূপ নিল “মুসলিম নিপীড়ন” আখ্যানে।
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিজ্ঞাপন (১২ মে ২০১৯)
দাড়ি রাখা, টাখনুর উপর কাপড় পড়াকে ‘জঙ্গিবাদের সূচক’ বানিয়ে প্রথম সারির পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ছাপানো হলো। মুসলিমদের ঈমানি চিহ্নকেই অপরাধ আখ্যা দেওয়া হলো। প্রতিবাদে মুসলিম সমাজ ফেটে পড়ল। অথচ পরে বিজ্ঞাপনদাতা দায় এড়িয়ে যায়।
ইসকনের প্রসাদ ষড়যন্ত্র (জুলাই ২০১৯)
চট্টগ্রামের ৩০টি স্কুলে কোমলমতি শিশুদের দিয়ে “হরে কৃষ্ণ” মন্ত্র পড়িয়ে প্রসাদ খাওয়ানো হলো। মুসলিম শিক্ষার্থীদের ধর্মবিশ্বাসকে পদদলিত করা হলো। এ ঘটনায় মুসলিম সমাজ বিক্ষুব্ধ হলেও রাষ্ট্র তা আড়াল করে।
ফরিদপুর, এপ্রিল ২০২৪
লোকসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে উগ্র হিন্দুরা নিজেদের মন্দিরে আগুন দিয়ে দুই মুসলিম নির্মাণ শ্রমিক আশরাফুল ও আসাদুলকে দায়ী সাব্যস্ত করে হত্যা করল। উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের রক্তকে পুঁজি করে আবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিস্থিতি সৃষ্টি করা।
২৫ অক্টোবর, ২০২৪
লালদীঘি ময়দানে সনাতনী জাগরণ মঞ্চের সমাবেশের দিন চট্টগ্রাম নগরীর নিউমার্কেট চত্বরে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার উপর ইসকনের গেরুয়া রঙের পতাকা টাঙানো হয়।
চিন্ময় দাস গ্রেফতার (২৫ নভেম্বর ২০২৪)
রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে চরমপন্থী হিন্দুত্ববাদী ধর্মগুরু চিন্ময় দাসের গ্রেফতারের পর আদালতে হিংস্র জন্তুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল ইসকনের হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা— পুলিশ-সামরিক বাহিনীর গাড়ি ভাঙচুর, সাংবাদিকদের গাড়ি ধ্বংস, আদালত প্রাঙ্গণের মসজিদ ভাঙচুর; এমনকি সরকারি আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে কুপিয়ে হত্যা। অথচ ভারতীয় মিডিয়া উল্টো প্রচারণা চালাল। রয়টার্স, ভয়েস অব আমেরিকার মতো আন্তর্জাতিক মিডিয়াও আলিফকে “চিন্ময়ের আইনজীবী” বানিয়ে সংবাদ ছাপাল।
আলিফ হত্যায় জড়িত বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির ছাত্র শুভ কান্তি দাশ একজন সক্রিয় ইসকন কর্মী। চিন্ময় দাসের জামিন না দেওয়ার প্রতিবাদে আদালত প্রাঙ্গণে আবারও ভাঙচুর চালায় ইসকন সমর্থকেরা।
আবরার ফাহাদ হত্যা (২০১৯)
ইসকনের সদস্য বুয়েট ছাত্রলীগ নেতা অমিত সাহা ছিল আবরার ফাহাদের হত্যার অন্যতম নেপথ্য কারিগর। অর্থাৎ মুসলিমবিদ্বেষ এখন হিন্দুত্ববাদী ছাত্র রাজনীতির রগে রগে ছড়িয়ে গেছে।
হাজারী গলির ঘটনা (৫ নভেম্বর ২০২৪)
“ইসকন বিরোধী পোস্ট” দেওয়ায় এক মুসলিম ব্যবসায়ীর দোকানে হামলা চালানো হয়। যৌথবাহিনী তাকে উদ্ধার করতে গেলে ইসকন সমর্থকেরা এসিড নিক্ষেপ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর।
আরএসএস পতাকা ব্যবহার
বাংলাদেশে সনাতনী জাগরণ মঞ্চসহ অন্যান্য সংগঠনের ছদ্মাবরণে ইসকন সরাসরি আরএসএসের পতাকা ব্যবহার শুরু করেছে নিজেদের বিভিন্ন গণজমায়েতে। পুজোৎসবে ব্যবহৃত হচ্ছে হিন্দুত্ববাদী “জয় শ্রী রাম” স্লোগান।
চট্টগ্রাম আদালত, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
“একটা একটা মোল্লা ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর”— চট্টগ্রাম কোর্ট পাড়ায় এই স্লোগান দেওয়া হলো প্রকাশ্যে। অথচ রাষ্ট্র তা দেখেও চুপ করে থাকল।
প্রতিটি পূজায় ত্রিশূল, রামদা দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র হাতে মহড়া দেয় হিন্দুরা, ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এ যেন পূজা নয়, প্রকাশ্য সামরিক প্রস্তুতির মহড়া।
এগুলোই কি উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড নয়? এগুলোই কি এই বাংলায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রকৃত চিত্র নয়? অথচ চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ইস্যুতে রাষ্ট্র আজ পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মতো করে হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষেই দাঁড়িয়েছে, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সচেষ্ট মুসলিম প্রতিবাদকারীদের উপর বরাবরের মতো দমননীতি চালু করতে চাইছে।
চন্দ্রনাথ পাহাড় নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের যে মিথ্যা আখ্যান দাঁড় করানো হচ্ছে, তা কোনো নিরীহ কাল্পনিক ধর্মীয় ইতিহাস নয়। এটি সেই নকশা, যা অযোধ্যায় বাবরী মসজিদ গুড়িয়ে দিয়ে রাম মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় আমরা দেখেছি।
এই একই কৌশল আজ চন্দ্রনাথ পাহাড়কে ঘিরে প্রয়োগ করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম তাদের কাছে নিছক ধর্মীয় স্থান নয়; বরং এটি পার্বত্য চট্টগ্রামে ভারতের “অখণ্ড ভারত” প্রকল্পের কৌশলগত ঘাঁটি। এখান থেকেই দিল্লি পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগলিক অখণ্ডতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে সেভেন সিস্টার্সকে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত করার ষড়যন্ত্র আঁকছে।
-
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে কাছাকাছি অবস্থানে হওয়ায় ভারতের কাছে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের রয়েছে কৌশলগত সামরিক গুরুত্ব। যদি এই পাহাড় ভারতের ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক দখলদারিত্বের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তবে তা পার্বত্য চট্টগ্রামে আমাদের সীমান্তবর্তী নিরাপত্তা ও সামরিক নজরদারিকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
-
চন্দ্রনাথ পাহাড়কে “শক্তিপীঠ” আখ্যা দিয়ে হিন্দুত্ববাদী তীর্থযাত্রীদের অনুপ্রবেশ কার্যত পার্বত্য চট্টগ্রামে ভারতের ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক উপনিবেশায়নকেই শক্তিশালী করবে। একবার এই বলয়ে ঢুকে পড়লে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগলিক অস্তিত্বের প্রশ্নে প্রশাসনও ধীরে ধীরে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সামনে নত হবে।
-
চন্দ্রনাথ পাহাড়ে হিন্দুত্ববাদীদের তীর্থযাত্রাকে ঘিরে পর্যটন ব্যবসা, জমি অধিগ্রহণ, স্থানীয় মুসলমানদের উচ্ছেদ— এসব শুরু হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাষ্ট্রীয় মালিকানা কাগজে লেখা থাকলেও বাস্তবে নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে ভারতের পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত শক্তির হাতে।
-
চন্দ্রনাথ পাহাড়কে কেন্দ্র করে তীর্থযাত্রা সম্প্রসারণের অর্থ হলো সীমান্ত অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় নাগরিকের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। একে যদি ‘ধর্মীয় ট্যুরিজম’ নামে বৈধতা দেওয়া হয়, তবে সেভেন সিস্টার্স সীমান্তে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। পাশাপাশি, পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্তিত্ব রক্ষায় সামরিক বাহিনীর উপস্থিতিকেও তখন প্রশ্নবিদ্ধ করা হবে।


