ইসলাম ও মুসলিম ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ⏱ ৬ মিনিট পড়া

কৌশলের নামে গণতন্ত্রের ফাঁদে ইসলামপন্থীরা

প্রকাশক — পর্যবেক্ষণ
কৌশলের নামে গণতন্ত্রের ফাঁদে ইসলামপন্থীরা


জুয়াড়িদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে: “The house always wins।” শেষ পর্যন্ত ক্যাসিনোই (জুয়াঘর) জিতবে। কিন্তু এই প্রচলন এবং আরও অনেক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও জুয়াড়িরা ধরে নেয় তারা ক্যাসিনোকে হারাতে পারবে।

ক্যাসিনো একটা ব্যবসা, কোন দাতব্য প্রতিষ্ঠান না। ব্যবসা মাত্রই প্রফিটের চিন্তা করবে। আর মাঝারি মানের কোনো ব্যবসায়ীও নিজের প্রফিটকে র‍্যান্ডম চ্যান্স বা দৈবচয়নের ওপর ছেড়ে দেবে না।

সমান সম্ভাবনার মায়া তৈরি করলেও ক্যাসিনোগুলো নিজেদের নেট প্রফিট নিশ্চিত করেই ‘খেলায়’ নামে। ক্যাসিনোগুলো এটা করে বিভিন্নভাবে।

যেমন—সাইকোলজিক্যাল ম্যানিপুলেশন: ঝলমলে আলো, উষ্ণ উত্তেজক পরিবেশ, সুন্দরী নারী, দ্রুতগতির মিউজিক, ‘খেলোয়াড়দের’ জন্য বিনামূল্যে মদ, যাদের পকেট ভারী তাদের জন্য কমপ্লিমেন্টারি রুম — এসবই ক্যাসিনোতে ঢোকা একজন মানুষের মধ্যে তারল্য নিয়ে আসে, উত্তেজনা সৃষ্টি করে।

এক সময় ক্যাসিনোগুলোতে কোনো ঘড়ি আর জানালা থাকত না, যাতে সময় সম্পর্কে ধারণা করা না যায়। ক্যাসিনোর ভেতরে রাত ৩টা আর দুপুর ৩টার মাঝে তফাত নেই।

এমন বিভিন্নভাবে ক্যাসিনো জুয়াড়ির ওপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সৃষ্টি করে। দরজা দিয়ে ঢোকা প্রতিটি মানুষকে যত বেশিক্ষণ সম্ভব আটকে রাখার উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি হয় ক্যাসিনোগুলো।

তবে এই মনস্তাত্ত্বিক কৌশলগুলোর ওপরেই শুধু ক্যাসিনোগুলো নির্ভর করে না। তাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল—খেলার নিয়মটা তারাই বানায়। এ কারণে প্রতিটি ‘খেলায়’ পরিসংখ্যানগতভাবে ক্যাসিনোর একটা সুবিধা — স্ট্যাটিস্টিকাল এজ (house edge) থাকে।

সোজা বাংলায়: জুয়ার প্রতিটি খেলার নিয়মগুলো এমনভাবে বানানো হয় যাতে করে দিনশেষে নিশ্চিত থাকে ক্যাসিনোর নেট প্রফিট। খেলতে হলে আপনাকে এই নিয়মেই খেলতে হবে — ক্যাসিনোর এ কর্তৃত্ব মেনে নিয়েই টেবিলে বসে জুয়াড়ি।

এসব কিছু জানার ও বোঝার পরও অনেক জুয়াড়ি মনে করে তারা ক্যাসিনোকে হারাতে পারবে। আর অতি, অতি অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া তারা ভুল প্রমাণিত হয়। লাভের নেশায় নিয়মিত হারতে থাকে; কেউ সর্বস্বান্ত হয়। তবু জেদ ধরে খেলা চালিয়ে যায়।

জেতার চেয়ে তখন তাদের ঘাড়ে শক্ত হয়ে চেপে বসে খেলার নেশা। দিনশেষে ক্যাসিনোই জিতে — The house always wins।

বর্তমান পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থা শর্তহীনভাবে প্রচার করা ও চাপিয়ে দেয়া ধর্ম, গণতন্ত্রের সাথে ইসলামপন্থিদের সম্পর্কটা ক্যাসিনো আর জুয়াড়ির মতো। একপক্ষ সব নিয়ম তৈরি করে; অন্যপক্ষ মাথা নিচু করে সেটা মেনে নেয়।

নিয়ম বানানোর সময়েই সিস্টেমটা এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে কিছু নির্দিষ্ট লোক সুবিধা পায়, আর কিছু নির্দিষ্ট লোক পড়ে বেকায়দায়। এর ওপর যেকোন সময় এক পক্ষ পূর্ণ অধিকার রাখে খেলার যেকোন নিয়ম বদলে ফেলার।

ক্যাসিনোর মতো গণতন্ত্রেও পকেট গরম লোকজনের কদর বেশি হয়। ইন থিওরি—অ্যাটলিস্ট, গন্ডমূর্খ আর সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষের পয়সার জেতার সমান সম্ভাবনা থাকে...

এরকম অনেক সাদৃশ্যের কথা বলা যায়। জুয়ার দৈবচয়ন আর গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে (আংশিক) দৈবচয়নের ভূমিকার মধ্যেও সাদৃশ্য লক্ষ না করে পারা যায় না। তবে এই মুহূর্তে আমার কাছে যেটা সবচেয়ে রিমার্কারেবল সাদৃশ্য মনে হচ্ছে, সেটা হল বারবার হারতে থাকা জুয়াড়ির সাথে ইসলামপন্থী গণতান্ত্রিকদের সাদৃশ্য।

জুয়াড়ি জানে যে সে হারবে; তবু সে খেলা চালিয়ে যায়। সে খেলা চালিয়ে যায় পরাজয়, ঋণ, অপমান, লাঞ্চনা, আত্মধিক্কারের পরও। ‘খেলার নেশা’ তাকে পেয়ে বসে। খেলার মজাটাই মুখ্য, জেতা না—এই বলে এ ধরনের আচরণের সাফাই গায় অনেক জুয়াড়ি। যদিও শুরুতে সে খেলতে নামে জেতার লক্ষ্য নিয়েই।

ইসলামী গণতান্ত্রিকরাও বারবার হারে। এমনকি যখন জিতে তখনও হারে। নব্বইয়ের দশকে আলজেরিয়ার ইসলামিক সালভেশন ফ্রন্ট, তুরস্কের — নাযিমুদ্দীন এরবাকান, মিশরের মুরসি, তিউনিসিয়ার নাহদা — উদাহরণ অনেক।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কখনো কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত কোন ফলাফল চলে আসলে, ক্যাসিনো জাস্ট খেলার নিয়ম বদলে ফেলে। এক জায়গায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বোমা ফেলে; আরেক জায়গায় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে হটাতে টেলিভাইজড ম্যাসাকারে একদিনে ১,৪০০ মানুষ মেরে ফেলে। পুরো খেলাই যে ওভাবে সাজানো। The house always wins।

এই পাতানো খেলায় বারবার হেরেও গণতান্ত্রিক ইসলামপন্থিরা গণতন্ত্রের সাফাই গেয়ে যান। নিজেদের উন্মাদনার (আইনস্টাইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী) পক্ষে নানা ব্যাখ্যা দেন। আর একসময় তারা—“খেলার মজাটাই মুখ্য, জেতা না”—এর মতো একটা কথা বানিয়ে নেন।

যেমন, ইসলামপন্থী অনেক দল গণতন্ত্রকে প্রথমে গ্রহণ করে একটি কৌশল হিসেবে। তাদের পথচলা শুরু হয় গণতন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে ইসলামি শরীয়াহ প্রতিষ্ঠার এক পাইপ-ড্রিম নিয়ে।

কিন্তু এক পর্যায়ে গিয়ে তাদের আন্দোলনের ফোকাস চলে যায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার দিকে, গণতন্ত্রের নীতিগুলো মানার দিকে, এবং যারা গণতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের না-মানুষ বানানোর পশ্চিমা প্রকল্পের অগ্রপথিক হবার দিকে।

টুল বা উপকরণ হিসেবে গণতন্ত্রকে ব্যবহার করার কথা বলে শুরু করলেও এক সময় তারা নিজেরাই স্থুল হাতে ব্যবহৃত-ব্যবহৃত হয়ে বলির পাঠা হয়ে যায়।

অনেকেই ৭০ ও আশির দশকে — ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য গণতন্ত্র—এই যুক্তি এনেছিলেন। কিন্তু তারপর সেটা হয়ে গেল—ইসলাম প্রতিষ্ঠার আগে গণতন্ত্র। আর এখন?

কল্যাণরাষ্ট্র, সহীহ ডেমোক্রেসি, মানবাধিকার আর ‘ইনসাফ’ প্রতিষ্ঠাই এক রকমের ঘোষিত লক্ষ্য। শরীয়াহ আর আলাপে নেই। যদি কালেভদ্রে কখনো উচ্চারিতও হয় তখন মনে হয় এমনটা না হলেই বোধহয় ভালো হতো। কারণ শরীয়াহকে পশ্চিমা/সেক্যুলার মনের কাছে ‘উপাদেয়’ করে তোলার জন্য এমন সব আলাপ করা হয়, যাকে বিকৃতি বললেও কম বলা হবে।

দেখুন—যেটা ছিল ‘কৌশল’ সেটা এখন উদ্দেশ্য হয়ে গেছে। খেলার মজাটাই মুখ্য, জেতা না! পাশাপাশি অনেকে সরাসরি কিংবা ঘুরিয়ে-প্যাচিয়ে এটাও বলছে, যে বর্তমানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠান-ই ইসলাম প্রতিষ্ঠা। এটাই সঠিক পদ্ধতি, আর যে এ পদ্ধতির বিরোধিতা করে সে হয়ে যায় জায়নিস্টদের এজেন্ট, কিংবা আল-সাউদের দালাল, অথবা রাজতন্ত্রের পক্ষে প্রচারণাকারী।

পঞ্চাশ বছর ধরে ইসলামী শরীয়াহ প্রতিষ্ঠার কাজ এগায়নি এক ইঞ্চি। কিন্তু গণতান্ত্রিক পদ্ধতি গ্রহণ করে নেওয়া ইসলামপন্থীরা নিজ আদর্শ থেকে ছিটকে পড়েছেন সহস্র মাইল দূরে।

আবেগের উদার স্রোতে মহিমান্বিত করা হচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের ভুলকে। পার্শ্ব জুয়াড়ির মতোই ইসলামী গণতান্ত্রিকরা প্রতি পরাজয়ের সাথে আরো বেশি টাকার বাজি ধরে; নামে আরো হাই স্টেকসের খেলায়। আর নিজেকে প্রবোধ দেয়—“আর একবার মাত্র; এক দামে জিতলেই উঠে নেয়া যাবে লাভে”—আসলে সব টাকা।

কৌশল পরিণত হয়েছে উদ্দেশ্য। জাদু ফিরে গেছে জাদুকরের দিকে। একটা মাকাভেলিয়ান লেভেলে ইসলামপন্থীদের পোষ মানানোর ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের এই মুন্সীয়ানার প্রশংসা না করার কোন উপায় নেই। বনের বাঘকে তারা নিজেদের গার্ডডগ বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।

ইসলামী রাজনীতির সাথে জড়িত একজন আরব নেতা কথায় কথায় পুরো ব্যাপারটা সামড-আপ করে বললেন—

“ভেড়া সাজিয়ে আমরা তাদের নেকড়েদের জগতে পাঠাই, আর সাবাড় হওয়া কঙ্কাল হয়ে তারা আমাদের কাছে ফিরে আসে।”

The house always wins.

শেয়ার করুন
Facebook X WhatsApp Telegram LinkedIn
QR কোড স্ক্যান করে পড়ুন
বিভাগ: ইসলাম ও মুসলিম © ২০২৬ পর্যবেক্ষণ

মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

একই বিভাগের অন্যান্য লেখা

লিবারেল মুখোশের আড়ালে জামায়াত: কেন ভয়টা থেকেই যায়
ইসলাম ও মুসলিম

লিবারেল মুখোশের আড়ালে জামায়াত: কেন ভয়টা থেকেই যায়

??ামায়াতকে আমি ভয় পাই—এই কথাটা কখনও ভয়ে বলি না। ভয়টা হলো, জামায়াত যত ক্ষমতাবান হবে, তত বেশি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়বে। এবং এই…

পর্যবেক্ষণ ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
যে সাফাই জামায়াতকে বাঁচায়, কিন্তু ইসলাহকে মেরে ফেলে
ইসলাম ও মুসলিম

যে সাফাই জামায়াতকে বাঁচায়, কিন্তু ইসলাহকে মেরে ফেলে

??ই মুহূর্তে জামায়াতের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল ভেতর থেকে গড়ে ওঠা কিংবা বাইরে থেকে যাওয়া একদল প্রজ্ঞাবান, ন্যায়নিষ্ঠ ও আদর্শে অবিচল উলামা…

পর্যবেক্ষণ ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
অপরিচ্ছন্ন জটাধারীদের নিয়ে ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতা
ইসলাম ও মুসলিম

অপরিচ্ছন্ন জটাধারীদের নিয়ে ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতা

??ম্প্রতি রাস্তায় অপরিচ্ছন্ন, জটাধারী কিছু লোককে ধরে তাদের জটা কেটে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দেওয়ার কিছু ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। এ…

পর্যবেক্ষণ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
↑