সম্প্রতি রাস্তায় অপরিচ্ছন্ন, জটাধারী কিছু লোককে ধরে তাদের জটা কেটে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দেওয়ার কিছু ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। এ ধরনের ঘটনা নতুন কিছু নয়, এমন ভিডিও আমার নজরে আগেও অনেক পড়েছিল। তবে এবার ব্যাপারটি দুটো কারণে সম্ভবত বেশি অ্যাটেনশন পেয়েছে।
ক) এবার কাজটা যারা করেছে তারা দাড়ি-টুপি-পাঞ্জাবিওয়ালা লোক, যেকারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন উত্থাপন করা অনেকের জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খ) জটাধারী কল্কিবাজরা জুলাইয়ের পর ক্ষমতার ভরকেন্দ্রের কাছে পৌঁছে গেছে, সুতরাং তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট দীর্ঘদিনের কুসংস্কারগুলোর প্রতি জনপরিসরে সহনশীলতা তৈরি করা দরকার হয়ে পড়েছে।
ঘটনার রাজনৈতিক চরিত্র যাই হোক, আমি একটু চেষ্টা করব ধর্মের লেন্সে ব্যাপারটাকে দেখতে, আমার জ্ঞানমতে। আমার জ্ঞানে কোনো ভুল থাকতে পারে না তা নয়, অতএব যেকোনো দালিলিক ও যৌক্তিক সমালোচনা ওয়েলকাম।
আমাদের সমাজে—শহরে হোক বা গ্রামে—মানুষ যতই মুখে বিজ্ঞান আর আধুনিকতার বুলি কপচাক না কেন, ডিপ ইন দেয়ার হার্ট, অতিপ্রাকৃত বিষয়ের প্রতি একধরনের ভয়, সমীহ ও আতঙ্ক রয়েই গেছে।
যেকারণে ন্যাংটা পাগল, জটাধারী কিংবা অস্বাভাবিক বেশভূষার যে কোনো মানুষের প্রতি তারা একটা বিশেষ ধারণা পোষণ করে। এদেরকে আল্লাহর ওলি, আখিয়ার, আব্দাল, আওতাদ, নুকায়েব, গাউস-কুতুব ইত্যাদি কিছু একটা মনে করে এবং এদেরকে বেশ সমীহ করে।
জটাধারীর সাথে ভালো ব্যবহার করে জীবনে ব্যাপক উন্নতি করার এবং জটাধারীদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে জীবন ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অসংখ্য গল্প সমাজে প্রচলিত আছে। এর কতটা মিথ আর কতটা সত্য, সেটা যাচাই করা সম্ভব নয়।
লোকেরা যদিও তাদের অস্বাভাবিক, নোংরা জীবনধারাকে একটা ধর্মীয় প্রলেপ দিতে আরাম বোধ করে, বস্তুত এগুলো ধর্ম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতারই ফসল।
একবার এক ল্যাংটা জটাধারীকে দেখে আমার পরিচিত একজন খুব সমীহ করে বলছিল, “আরেহ, গোপন কিছু না কিছু রহস্য লুকানো আছে।”
আমার সাথে থাকা আরেক মাওলানা বন্ধু ল্যাংটার পুরুষাঙ্গের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, “গোপন যা থাকার তা তো প্রকাশ্যেই দেখা যাচ্ছে, আর কী কচু গোপন আছে!”
ইসলাম ধর্মে এ ধরনের নোংরাভাবে চলাফেরা করার, জটা বাঁধানো, গোসল না করা, নামাজ-কালাম না পড়া, উলঙ্গ বা অর্ধনগ্ন থাকার কোনো সুযোগ নেই।
এবং এ ধরনের জীবনযাপনকারীদের প্রতি কোনো অতিপ্রাকৃত ধারণা পোষণ করার ব্যাপারে আমাদেরকে আল্লাহ কিংবা রাসূল কোনো শিক্ষা দেননি।
রাস্তায় নোংরাভাবে চলাফেরা করা লোকদেরকে তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়:
প্রথম শ্রেণি:
কিছু মানুষ সত্যিই কোনো কারণে মানসিকভাবে পাগল হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। নাওয়া-খাওয়া নেই, গোসল নেই, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নেই।
অনেক সময় এদের গায়ে খুজলি, পাচড়া হয়, রাস্তায় পড়ে থাকে। বস্তুতই এরা পাগল এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন।
এদেরকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যত্ন করা, চুল-নখ কেটে দেওয়া, চিকিৎসা দেওয়া, পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া, পরিবার না পেলে কোনো সামাজিক সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা খুবই ভালো কাজ।
আমার জানামতে, এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা এই কাজ করে থাকে।
দ্বিতীয় শ্রেণি:
বস্তুত এরা পাগল ছিল না, পাগল নয়ও। এরা লালনবাদী কিংবা এ ধরনের কোনো মাজার বা আখড়ায় যাওয়া-আসার কারণে নেশাপানি করতে করতে আস্তে আস্তে পরিবার থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়।
এরপর এসব আখড়ার অন্যান্যদের সাথে মিলে গাঁজা, সিদ্ধি, হুক্কা ইত্যাদি নানাধরনের নেশা-ভাং করে এবং এদের অনেকের আখড়ার কিংবা একই আদর্শের নারীসঙ্গীদের সাথে এরা অনেক ধরনের বিকৃত যৌনাচারেও লিপ্ত হয়।
গোসল নেই, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নেই, স্বাভাবিক জীবন নেই। একসময় চুলে জটা ধরে, হাতে সর্পাকৃতি লাঠি ইত্যাদি জুটিয়ে নেয়। আখড়া থেকে শেখা নানা গান-টান গায়।
আদর্শিক ও শারীরিকভাবে অপবিত্র এই লোকগুলোর উপর জ্বিন-শয়তান ভর করে।
নানারকম শিরক-কুফর আর নোংরামিকে নরমালাইজড করার ক্ষেত্রে জ্বিন-শয়তানদের মানবীয় শিষ্য ও মাধ্যমে পরিণত হয় এরা।
জ্বিনেরা এদের মারফত অনেক সময় আশ্চর্য কিছু ঘটিয়ে মানুষের ঈমান ধ্বংস করে, শিরকে লিপ্ত করে।
একটা আদর্শ মুসলমান সমাজের দায়িত্ব হলো এই লোকগুলোকেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা।
তবে অবশ্যই সেটা করতে হলে প্রশাসন, সমাজের আলিম-উলামা ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত ও পরিকল্পিত উপায়েই করতে হবে।
আমরা যেহেতু একটা অসভ্য সেক্যুলার সমাজে বসবাস করি, এখানে আমাদের কারোই সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার আইনগত অধিকার নেই, এখানে ভালো-মন্দের কোনো চূড়ান্ত সংজ্ঞাও নেই।
এখানে চূড়ান্ত মা’বুদ হলো নফস, যাকে আমরা আদর করে নাম দিয়েছি ব্যক্তিস্বাধীনতা।
এই ব্যক্তিস্বাধীনতার আওতায় মানুষ গাঁজা-ভাং খাবে, সিদ্ধি করবে, চুলে ইচ্ছে করে জটা ফেলবে, নোংরা থাকবে—কিন্তু আপনি কিছু বলতে পারবেন না।
সেক্যুলার রাষ্ট্রের মধ্যে আপনার কোনো অধিকার নেই কাউকে জোর করে ধরে এনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার।
তারপরও কেউ যদি অতি আগ্রহী হন, তাদের প্রতি আমার পরামর্শ হলো:
তাদেরকে নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে আপনাদের আচরণে যেন নম্রতা ও দয়ামায়ার ছাপ স্পষ্ট থাকে।
যদি করেনই, তাদেরকে সত্যিই ভালোবাসা ও যত্ন দেওয়ার চেষ্টা করুন, আচরণে যেন কোনো হিংস্রতা না থাকে।
কয়েকটা ভিডিও দেখে আমার কাছে আপনাদের আচরণ এপ্রোপ্রিয়েট মনে হয়নি।
এ ধরনের কাজ আপনারা কেন সোশ্যাল মিডিয়ায় আনছেন?
এটা তার প্রাইভেসি লঙ্ঘন। আপনাদের অধিকার নেই এগুলো ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়ার।
ভিউ কামানোর জন্য যদি আপনারা এগুলো করে থাকেন, তাহলে এদের চেয়ে আপনারাও কম নোংরা নন—
পার্থক্য হলো, তাদের শরীর নোংরা আর আপনাদের মন।
এদের নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, থানা-পুলিশ ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গকে সাথে নিয়ে নিন,
যেন আপনাদের কাজটি যথাযথভাবে হয় এবং কেউ অকারণ ভুল ব্যাখ্যা করতে না পারে।
আমাদের কিছু ভাই এসব জটাধারী, নোংরা, অপরিচ্ছন্ন লোকদেরকে হাদিসে বর্ণিত কিছু চরিত্রের সাথে মিলিয়ে
এদেরকে সেই আল্লাহর ওলি-বুজুর্গ সাব্যস্ত করার চেষ্টা করছেন, যাদের দোয়া কবুলের কথা এসেছে।
ভাইলোগ, এতটা বোকা হইয়েন না।
লালনবাদী, মাজার-আখড়ার জটাধারী, বেনামাজি, শরিয়া লঙ্ঘন ও অস্বীকারকারী লোকেরা হাদিসে বর্ণিত সেসব লোক নয়।
আল্লাহরওয়াস্তে, নিজেরা ধোঁকা খাবেন না, অন্যদের ধোঁকা দেবেন না।
হাদিসে বর্ণিত লোকেরা হলেন—তারা যারা দরিদ্র, যাদের জামাকাপড় দামি নয়, শতেক জোড়াতালি দেওয়া
, ধুলিমলিন চেহারা,
লোকেরা যাদের দাম দেয় না, সমাজে যারা সম্মানিত নন—
কিন্তু তারা এত বেশি ইবাদতগোজার যে, আল্লাহ তাদের বিশেষভাবে ভালোবাসেন।
আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের কাপড় কমদামি থাকতে পারে, ছেড়া থাকতে পারে, জোড়াতালি থাকতে পারে—
কিন্তু তা ইসলামের পরিচ্ছন্নতার নীতি লঙ্ঘন করতে পারে না।
তারা নেশাপানি করতে পারে না, নামাজ-কালাম ত্যাগ করতে পারে না, অপবিত্র থাকতে পারে না, জটাধারী হতে পারে না।
হাদিসে মূলত এদের কথাই বলা হয়েছে।
কোনো নোংরা জটাধারী, ন্যাংটা ও গাঁজাখোরদের কথা বলা হয়নি।
তাই দয়া করে নিজের মূর্খতাকে জ্ঞান আর দীনদারির লেবাস পরিয়ে অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেবেন না।
মো আহমেদ রফিক