দেওবন্দি ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে জামায়াতি প্রোপাগান্ডা: ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ
গোবর পচলে সার হয়, কিন্তু জাশি পচলে ল্যাটকা গু হয়। এ যাবৎ যতটা এক্স জাশি দেখলাম, সবাইকেই হাফ শাহবাগি হতে দেখলাম।
খোমেনি ইহসান নামের এক্স শিবিরের এই নেতা তালেবান ও উলামায়ে দেওবন্দ নিয়ে বিষোদগারমূলক একটা পোস্ট করেছেন। তালেবানরা দেওবন্দি, আর দেওবন্দিরা নাকি গাদ্দার! জামায়াতিরা নাকি হেফাজতিদের টাকা দিয়ে ব্যবহার করেছে! লীগের আমলে নাকি কওমিরা লীগের দালালি করেছে! ব্লা... ব্লা...
জি হ্যাঁ, তালেবানরা দেওবন্দি— এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু উলামায়ে দেওবন্দ গাদ্দার হলেন কীভাবে? ভারতভাগ-সময়কার দ্বিজাতিতত্ত্ব নিয়ে সৃষ্ট সেই রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ও বিদ্বেষ আজও উগরে যাচ্ছে এই গাণ্ডুরা!
খুব সংক্ষেপে বলি—
দ্বিজাতিতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে হিন্দুস্তান ভাগ করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার রাজনীতিতে পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তি তৈরি হয়েছিল। পক্ষের শক্তি ছিল মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ ও আল্লামা ইকবালের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ। আর বিপক্ষে ছিল মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস।
ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের অগ্রসেনানী খোদ উলামায়ে দেওবন্দই দ্বিজাতিতত্ত্ব তথা হিন্দুস্তান ভাগের রাজনীতিতে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন।
দারুল উলুম দেওবন্দের শায়খুল হাদিস, জমিয়ত নেতা, সাইয়িদ হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.), মাওলানা আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ ছিলেন অখণ্ড ভারতের পক্ষে— কংগ্রেসের সঙ্গে। তারা বৃহত্তর স্বার্থে হিন্দু ও মুসলিম— দ্বিজাতিত্বের পরিবর্তে হিন্দু-মুসলিম মিলে একজাতিতত্ত্বের রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন।
অপরদিকে দারুল উলুম দেওবন্দের সিনিয়র মুহাদ্দিস মাওলানা শিব্বির আহমদ উসমানি, আরেক মুহাদ্দিস মুফতি শফি, উলামায়ে দেওবন্দের শীর্ষ মুরুব্বি মাওলানা আশরাফ আলি থানবিসহ বড়দের বিরাট একটি অংশ দ্বিজাতিতত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। তারা জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের পক্ষে ছিলেন।
এই দ্বিজাতিতত্ত্ব নিয়ে তৎকালীন সময়ে কাদা ছোড়াছুঁড়ি কিন্তু কম হয়নি। এই রাজনৈতিক মতানৈক্য এসে প্রভাব ফেলে আমাদের দেশেও। আমাদের দেশের উলামায়ে দেওবন্দও দুই ভাগে ভাগ হয়ে যান।
মাদানি (রহ.)-এর শিষ্য, মুরিদ ও জমিয়তের অনুসারীরা ভারতভাগের বিরোধিতামূলক রাজনীতি করেন। ফলে তাদেরকে কংগ্রেসের দালাল বলে ট্যাগ দেওয়া হতো। এই মতের অনুসারী বেশি ছিলেন আমাদের সিলেটেই।
অপরদিকে সিলেটেরই আরেক দেওবন্দি কৃতিসন্তান মাওলানা আতহার আলি (রহ.) ছিলেন খণ্ড ভারত তথা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে। এজন্য তাকেও অনেক গ্লানি সহ্য করতে হয়।
সেই উত্থাল রাজনৈতিক সময়ে অবশেষে বিজয় লাভ করেন দ্বিজাতিতত্ত্ব তথা খণ্ড ভারত— মানে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষের শক্তি।
পাকিস্তান হয়ে গেলে দারুল উলুম দেওবন্দের মুহাদ্দিস ও মুফতি শফি (রহ.) দেওবন্দ থেকে হিজরত করে মুসলমানদের রাষ্ট্র পাকিস্তানেই চলে যান এবং করাচিতে থিতু হন। সেখানেই প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহাসিক দারুল উলুম করাচি মাদরাসা। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মুফতি শফির অবদানের কারণে আজও মুফতি শফির পরিবার পাকিস্তান সরকারের কাছে অত্যন্ত মান্যবর ও সম্মানিত। মুফতি শফির ছেলে মুফতি তাকি উসমানিকে এজন্যই পাক সরকার এত মূল্যায়ন করে। মুফতি শফির পরিবার পাকিস্তানকে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র মনে করে।
রাজনীতিতে ভিন্নমত ও ভিন্ন দর্শন স্বাভাবিক। ভারত ভাগ ইস্যুতেও উলামায়ে দেওবন্দের মধ্যে ভিন্নমত ও ভিন্ন দর্শন ছিল। নিজেরাই এখানে দুই ভাগ ছিলেন— এক ভাগ জয়ী হয়েছেন, আরেক ভাগ হননি।
যারা দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন, তাদের যুক্তি ও দর্শন সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে ঠিক ছিল। আবার যারা অখণ্ড ভারতের পক্ষে ছিলেন, তাদেরও যুক্তি ও দর্শন ফেলে দেওয়ার মতো ছিল না।
যে উদ্দেশ্যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করা হয়েছিল, তা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, তা তো আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। আর যারা অখণ্ড ভারতের পক্ষে ছিলেন, তাদের দর্শনের বাস্তবতাও আজ সকলের চোখের সামনে।
জমিয়তের হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর অন্যতম দর্শন ছিল— মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে হিন্দুস্তানের কোটি কোটি মুসলিম সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে। এরা আজীবন নির্যাতিত হয়ে এবং পিছিয়ে থাকবে। পশ্চিম ও পূর্ব— দুই পাকিস্তান করা হলে একসময় পূর্ব পাকিস্তানও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এতে করে পাকিস্তানের ক্ষতি আর ভারতের লাভ হবে।
আজ বাস্তবতাও তা-ই বলে। মাদানির সেই সময়ের রাজনৈতিক দর্শন মোটেও ভুল ছিল না। কালের পরিক্রমায় বাস্তব হয়ে দেখা দেওয়া সেই পুরনো রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে আজও কিছু গান্ডু প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যাচার করেই যাচ্ছে!
এক্ষেত্রে জাশি এক ধাপ এগিয়ে। কারণ, জাশির গুরু মাওলানা মওদুদি সাহেব ছিলেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে। ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর যখন মওদুদি সাহেবের গোমরাহি ও ভুলভ্রান্তি একের পর এক প্রকাশ পেতে থাকে এবং মাদানি (রহ.)-সহ উলামায়ে দেওবন্দ সেগুলো ধরে ধরে বিরোধিতা করতে থাকেন, তখন থেকেই মওদুদি সাহেবের অনুসারীরা এখন পর্যন্ত মাদানি (রহ.) ও দেওবন্দিদেরকে কংগ্রেসের দালাল, হিন্দুদের দালাল বলে খেদ মিটিয়ে আসছে! অথচ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পেছনে মওদুদি সাহেবের মতো উলামায়ে দেওবন্দের বড় একটা অংশ রাজপথ কাঁপিয়েছে!
জনাব খোমেনি ইহসান এক্স জাশি। তাই জামায়াতিদের খাইসটামি এখনও পুরোপুরি ছাড়তে পারেননি। এসব আসলে পুরোপুরি ছাড়াও যায় না।
এবার আসি হেফাজতের আন্দোলন প্রসঙ্গে—
জামায়াত সবসময় একটা সুবিধাবাদী দল। পরের মাথায় কাঠাল ভেঙে খাওয়ার রাজনীতিতে পারদর্শী। নিজেদের নেতাদের জেল, জুলুম ও ফাঁসির বিরুদ্ধে কিছুদিন রাজপথে কুচকাওয়াজ করে টিকতে না পেরে ঘরবাড়িতে আশ্রয় নিয়ে ইয়া নফসি, ইয়া নফসি করছিল, তখনই ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম শাহবাগীদের বিরুদ্ধে মাঠে নামে। তখন রাজনীতির চিরাচরিত ডিগবাজ জামায়াত ব্যবহার করতে চেয়েছিল হেফাজতকে। আমি তখন হাটহাজারির ছাত্র। পানির বোতল আর বিরিয়ানির প্যাকেট দিয়ে হেফাজত কর্মীদেরকে মাঠে টিকিয়ে রেখে এক সুযোগে লীগের পতন ঘটিয়ে নিজেদের নেতাদের মুক্ত করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু হেফাজত নেতারা সেই সুযোগ না দেওয়ায় আজও তারা হেফাজতকে দেখতে পারে না।
নাপাকিস্তান আমেরিকার এক নম্বর দালাল। আমেরিকাকে পাকিস্তানের ভূমি ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে ২০ বছর আফগানিস্তানে রক্ত ঝরিয়েছে। সেই হিসেবে এই পাকিস্তানেরও আমেরিকার সঙ্গে শেয়ারিটি আছে। তালেবান তো এসব ভুলে যায়নি। ব্যতিক্রম ছিলেন ইমরান খান। তাই তালেবান তাকে সাপোর্ট করত। কিন্তু ইমরান খানকে সরিয়ে যারা গদিতে এসেছে, এরা আমেরিকার পুরনো বিশ্বস্ত দালাল। তাই তালেবান এদেরকে ছাড় দিতে চায় না।
ওদিকে ভারতও পাকিস্তানের শত্রু। তাই আন্তঃরাজনৈতিক কারণে তালেবান ও ভারতের একটা ঘনিষ্ঠতা হবে— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জাশি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কোনোভাবেই পাকিস্তানপ্রীতি ছাড়তে পারছে না। তাই ভারতের সঙ্গে তালেবানের ভূরাজনৈতিক খাতির সহ্য
করতে পারছে না। পুরো বটবাহিনী নিয়ে সাইবার যুদ্ধে নেমেছে!
লেখাটা বড় হয়ে যাচ্ছে, শেষ করছি...
হ্যাঁ, একথাটা ঠিক— আমাদের হাতেগোনা কিছু লোক লীগের হাতে বিক্রি হয়ে গেছে। তাই বলে সবাই তো আর বিক্রি হয়ে যায়নি। লীগের পনেরো বছরের দুঃশাসনে সবচেয়ে বেশি রক্ত ঝরিয়েছে কওমি অঙ্গনের লোক। একথাটা কে না জানে! আগে ও পরে— সব মিলিয়ে লীগের সকল আমলেই সবচেয়ে বেশি জেল-জুলুমের শিকার হয়েছে এদেশের উলামায়ে দেওবন্দ। কিন্তু এই জাশির গান্ডুগুলো এখন এসব বলে কী?!
কিন্তু আমরা তো বিপরীত ইতিহাসও জানি। নিজেদের নেতাদের ফাঁসির আসামি বানিয়ে রেখেও রাজনীতি-বাণিজ্য করেছে জামায়াতের বহু বড় বড় নেতা! নেতাদের ফাঁসি মেনে নিয়ে, রাজপথের আন্দোলন থেকে সরে আসার মুচলেকা দিয়ে, নানান সুবিধা ভোগ করে ১৫টা বছর নিরিহ জীবনযাপন করেছেন জামায়াতের অনেক নেতা। কিন্তু ৫ আগস্টের পর এই তারাই এখন আবার বড় বড় বুলি আওড়াচ্ছেন!
লেখক আইনুল হক কাসেমী
