ন্যায্য মজুরি ও মানবিক কর্মপরিবেশের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের উপর যৌথ বাহিনীর গুলিতে হাবিবুর রহমান (২১) নামে এক তরুণ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। আজ নীলফামারির একটি শিল্পাঞ্চলে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহত হাবিবুর রহমানসহ হাজারো শ্রমিক তাদের ২০ দফা দাবি আদায়ের জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছিলেন।
শ্রমিকদের উত্থাপিত দাবিগুলোর মধ্যে ছিল—অতিরিক্ত উৎপাদনের টার্গেট বাতিল, গর্ভবতী নারী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সুবিধা, ওভারটাইমের সঠিক মজুরি, সময়মতো বেতন-ভাতা পরিশোধ, এবং কর্মক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধের মতো মৌলিক অধিকার। এই দাবিগুলোকে কোনোভাবেই অন্যায্য বলার সুযোগ নেই, বরং এগুলো শ্রম আইনেরই অংশ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের এক পর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সেনা-পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী আন্দোলনরত শ্রমিকদের উপর গুলি চালায়। এতে হাবিবুর রহমান গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। তিনি চেয়েছিলেন, তার গর্ভবতী সহকর্মী যেন সামান্য মানবিক সুবিধা পান; চেয়েছিলেন, দাসের মতো খাটুনির অবসান হোক। কিন্তু অধিকারের এই দাবি জানাতে গিয়ে তাকে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে হলো।
এই ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, রাষ্ট্র কি পুঁজিপতি মালিকদের স্বার্থ রক্ষায় এতটাই মরিয়া যে শ্রমিকের বুকে গুলি চালাতেও দ্বিধা করে না?
নারীবাদী সংগঠনগুলোর ভূমিকা ও বিতর্ক
আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল "গর্ভবতী নারী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা"। এটি সরাসরি একটি নারী অধিকারের ইস্যু হওয়া সত্ত্বেও, দেশের মূলধারার নারীবাদী সংগঠনগুলোকে এই বিষয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে নীরব থাকতে দেখা গেছে, যা তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচকরা কঠোর ভাষায় মন্তব্য করছেন যে, এই নীরবতা নারীবাদী আন্দোলনের একটি দ্বিচারী ও শ্রেণিভিত্তিক চরিত্রকে উন্মোচিত করেছে। তাদের মতে, আন্দোলনরত শ্রমিকরা হতদরিদ্র এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশ হওয়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ নারী ইস্যুটি তাদের কাছে অগ্রাধিকার পায়নি।
সমালোচকদের একটি বড় অংশ অভিযোগ করেছেন যে, অনেক নারীবাদী সংগঠন কেবল সেসব নারী ইস্যুতেই সোচ্চার হয়, যেগুলো শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে আকর্ষণ করে অথবা বিতর্কের জন্ম দেয়। তাদের মতে, "কিছু নারীবাদী আন্দোলন অশ্লীলতা ও পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রচারে সহায়ক ভূমিকা রাখে এবং সেসব ক্ষেত্রেই তাদের তৎপরতা সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু কারখানার একজন গর্ভবতী নারী শ্রমিকের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে তারা সুবিধাজনকভাবে নীরব থাকে।"
এই "নির্বাচিত প্রতিবাদ" (selective activism) নারীবাদী আন্দোলনের সার্বজনীনতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সমালোচকদের মতে, নারী অধিকারের সংগ্রাম যদি শ্রেণি, ধর্ম ও সংস্কৃতি নির্বিশেষে সকল নারীর জন্য সমানভাবে সোচ্চার না হয়, তবে তা তার মূল লক্ষ্য থেকেই বিচ্যুত হয়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়।