লিবারেল মুখোশের আড়ালে জামায়াত: কেন ভয়টা থেকেই যায়
সূচিপত্র
লিবারেল মুখোশের আড়ালে জামায়াত: কেন ভয়টা থেকেই যায়
জামায়াতকে আমি ভয় পাই—এই কথাটা কখনও ভয়ে বলি না। ভয়টা হলো, জামায়াত যত ক্ষমতাবান হবে, তত বেশি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়বে। এবং এই প্র্যাক্টিস বাই ন্যাচার তাদের দলের মধ্যে আছে। ২০০৭ সালে আমাকে তারা জঙ্গি বলে পুলিশে ধরিয়ে দিতে চাইছে, সেই ঘটনা আগে বলেছি, আর না বলি।
কওমি মাদরাসায় পড়ুয়াদের প্রতি তাদের যে প্রবল তাচ্ছিল্য, এবং সেটা ন্যাংটা বামদের চেয়েও বেশি, তা–ও দেখেছি বহুবার। আমাদের এলাকার শিবির নেতাদের মুখে একাধিকবার শুনেছি, কওমির পোলাপান তসবি টিপতেও জানে না।
তাবলিগ জামায়াতকে ইহুদিদের পরিচালিত সংগঠন বলা ছিল একসময় জামায়াতের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। দৈনিক নয়াদিগন্তের পেপার কাটিংটা খুঁজলে এখনও পাব, যেখানে বাটার কারখানার পাশে টঙ্গি ইজতিমার ময়দান হওয়াকে ইহুদিদের ফান্ডিং পাওয়ার অন্যতম প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয়। আমি নিজে বহু সময় তাবলিগে কাটানোয় বিভিন্ন মসজিদে কীভাবে ‘ফাজায়েলে আমাল’ তালিম বন্ধ করে তাদের আলিম পাশ কর্মীদের তাফসির শুনতে বাধ্য করা হয়েছে, সেই স্মৃতি মাথায় গেঁথে আছে।
গত রমজানে রোজা না রেখে হোটেলে বসে খাওয়ার ‘অপরাধে’ কান ধরে উঠবস–করানো কিংবা নির্বাচনে জান্নাতের টিকিট বিক্রির ক্যাম্পেইন দেখে অনেকে ভাবেন, এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু আমি বলি, এইটা জামায়াতের স্বভাব, কর্মীদের দীর্ঘদিন যে কালচারের মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে, তার ছিঁটেফোঁটা প্রকাশ মাত্র।
জামায়াত–অনুরাগী ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এক এমডিকে সাপ্তাহিক কাগজ পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কীসব নোংরা গল্প ছাপা হয়েছে, তারপরও নিয়মিত এখানে বিজ্ঞাপন দেন। কেন? অথচ ইসলামি ভাবাদর্শের পত্রিকাগুলো বিজ্ঞাপন পায় না। বললেন, ইসলামি পাঠকরা তো আমাদের বাই ডিফল্ট কাস্টমার, জানাতে হবে বাইরের লোককে। বললাম, তাইলে জামায়াতের পত্রিকাগুলোতে কেন পায়? বললেন, ইসলামের খেদমতের তাড়নাও আমাদের আছে।
‘ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ’ বলে এইটাই বলতে চাইছি যে, জামায়াত ধর্মকে সাধারণ মানুষের ওপর চাপাতে চায় কি না, বা পারবে কি না জানি না, কিন্তু আলেমদের উপস্থিতি প্রায় শূন্য অবস্থায় জামায়াতের ভেতর নিজস্ব একটা ধর্মীয় মাতদর্শ গড়ে উঠেছে দীর্ঘ দিনে, সেটা ধর্মীয় অন্যান্য গোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তাদের মধ্যে আছে। এবং এমন বহু ঘটনার সাক্ষী আমি নিজেও।
ফলে জামায়াত ক্ষমতাবান হলে ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ঘরানার লোকজন বিপদে পড়তে পারেন, এমন একটা আশঙ্কা কাজ করছে, রাজনীতিতেও তার প্রভাব পড়েছে। কওমিপন্থিদের রাজনৈতিক নেতারা যে দুই জোটে ভাগ হয়ে গেছেন, এতে মাদরাসা পরিচালকদের মধ্যে একরকমের স্বস্তি বিরাজ করছে; কারণ জামায়াত তাদের সঙ্গে বিট্রে করলে অন্তত সবাই তো বিপদে পড়ল না, অন্য দলের নেতারা সামলাতে পারবেন।
যা–ই হোক, আমি সবসময়ই মনে করি, জামায়াত একটা ফার রাইট দল। জুমা আপাকে সাদিক কায়েম পাশে বসাইছেন বলে, কিংবা শফিক সাহেব নারীদের সাক্ষাৎকার দেওয়ার মধ্য দিয়ে দলটা লিবারেল হয়ে উঠেছে বা ডান থেকে সেন্টারে চলে এসেছে—এটা আমি বিশ্বাস করি না।
আমার আশেপাশে জামায়াত–অনুরাগী বা অনুসারী কিছু সংস্কারমুক্ত ভালো মানুষ আছেন, তারা ভেতরে ভেতরে সমালোচনায় মুখরও বটে, কিন্তু দীর্ঘদিনের কালচার থেকে তারা জামায়াতকে মুক্ত করতে পারবেন বলে মনে হয় না। আওয়ামীলীগ–বিএনপির বিকল্প এই দেশে জামায়াত না। তাহলে কে—এইটা একটা মিলিয়ন ডলার কোশ্চেন।
লেখক মনযুরুল হক
