এপস্টিন ফাইলের রাজনীতি: সত্যের প্রকাশ নাকি কৌশলগত ফাঁস
সূচিপত্র
এপস্টিন ফাইলের রাজনীতি: সত্যের প্রকাশ নাকি কৌশলগত ফাঁস
এপস্টিন ফাইল আবার আলোচনায়। বলা হচ্ছে—অবশেষে সত্য বেরিয়ে আসছে। কিন্তু ইতিহাস জানে, সত্য হঠাৎ বের হয় না; সত্যকে বের করা হয়। আর সেই “কেন এখন”—এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
জেফ্রি এপস্টিন নতুন কোনো অপরাধী নয়। ২০০৮ সালেই সে দোষ স্বীকার করেছিল। ভিকটিমদের অভিযোগ,
আদালতের নথি,
সাংবাদিক অনুসন্ধান—সবই বহু বছর ধরে বিদ্যমান। তাহলে এতদিন পরে কেন এই ফাইল আবার সামনে আনা হলো? কী এমন বদলালো, যে পুরোনো অপরাধ নতুন নৈতিকতার প্রতীকে পরিণত হলো?
আমরা ধরে নিই—যারা এই ফাইল সামনে আনছে, তারা ন্যায়পরায়ণ। কিন্তু ইতিহাস আমাদের এই সরল বিশ্বাস থেকে সাবধান করে। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে একজন প্রেসিডেন্ট পড়েছিল, কিন্তু ক্ষমতার গভীর কাঠামো অক্ষত ছিল। ইরান–কন্ট্রা অ্যাফেয়ারে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছিল, আবার রাজনৈতিক ক্ষমায় তা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। অর্থাৎ, তদন্ত হয়েছে—কিন্তু সিস্টেম নিজেকে বিচার করেনি।
এপস্টিন কেসেও কি একই প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে না?
কিছু নাম আলোচনায় আসে,
কিছু নাম থাকে “অনুসন্ধানাধীন”, আর অধিকাংশ নাম হারিয়ে যায় মিডিয়ার কোলাহলে। যদি এটি সত্যিই ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হতো, তাহলে আমরা দেখতাম শক্তিশালী ব্যক্তিদের প্রকাশ্য বিচার, দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রক্রিয়া এবং ভিকটিমদের পূর্ণ ন্যায়বিচার। বাস্তবে তা হচ্ছে না।
এখানে তদন্তকারীদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। তারা হয়তো এপস্টিনের মতো বিলিয়নিয়ার নয়, কিন্তু তারা সাধারণ নাগরিকও নয়। তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের অংশ—যে রাষ্ট্রযন্ত্র ইতিহাসজুড়ে গোপন ফাইল, ব্ল্যাকমেইল এবং “কন্ট্রোলড লিক” ব্যবহার করে ক্ষমতার ভারসাম্য ঠিক করেছে।
ইতিহাসে এর নজির আছে। যুদ্ধ বা বড় আগ্রাসনের আগে ক্ষমতাবানদের মধ্যে “নৈতিক পুনর্বিন্যাস” ঘটে। কারা গ্রহণযোগ্য, কারা ঝুঁকিপূর্ণ—তা ঠিক করা হয়। রোমান সাম্রাজ্য থেকে আধুনিক রাষ্ট্র—যুদ্ধের আগে দরবার পরিষ্কার করা হয়েছে, আপত্তিকর চরিত্রদের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।
আধুনিক যুগে এই নিয়ন্ত্রণ হয় ট্যাংক দিয়ে নয়,
ফাইল দিয়ে। পুরো সত্য প্রকাশ নয়, বরং প্রয়োজনমতো সত্য দেখিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়। আমাদের সমাজেও আমরা জানি—পুরো কেলেঙ্কারি নয়, বরং নির্বাচিত অংশ ফাঁস করে কাজ আদায় করা হয়। তাহলে বৈশ্বিক ক্ষমতাকেন্দ্রে এই কৌশল অচল—এমন বিশ্বাস আসে কোথা থেকে?
ভিকটিমদের অবস্থান এখানে সবচেয়ে করুণ। তাদের কষ্ট ব্যবহৃত হয় নৈতিক উচ্চতা দেখানোর জন্য,
কিন্তু বাস্তব ন্যায়বিচার—নিরাপত্তা, ক্ষতিপূরণ, সম্মান—এসব প্রশ্ন আড়ালেই থেকে যায়। এতে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়: এটি কি ভিকটিমদের জন্য, নাকি ক্ষমতার হিসাব–নিকাশের জন্য?
ক্ষমতা সাধারণত নিজের বিরুদ্ধে মামলা চালায় না। সে নিজের ভেতরের দ্বন্দ্ব মেটাতে কাউকে সামনে আনে,
কাউকে আড়ালে রাখে। এপস্টিন ফাইল সেই পুরোনো সত্যটাই আবার সামনে আনছে—প্রশ্নটা অপরাধ আছে কি না, তা নয়; প্রশ্ন হলো, এই অপরাধ এখন কাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে, এবং কেন।
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
হয়তো
আমরা অচিরেই এর উত্তর পেয়ে যাবো, তবে সে পর্যন্ত অপেক্ষার প্রহর গুণতে হবে।
মো. সাইফুল ইসলাম
