ইসলাম ও মুসলিম ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ⏱ ৫ মিনিট পড়া

যে সাফাই জামায়াতকে বাঁচায়, কিন্তু ইসলাহকে মেরে ফেলে

প্রকাশক — পর্যবেক্ষণ
যে সাফাই জামায়াতকে বাঁচায়, কিন্তু ইসলাহকে মেরে ফেলে

যে সাফাই জামায়াতকে বাঁচায়, কিন্তু ইসলাহকে মেরে ফেলে 




 এই মুহূর্তে জামায়াতের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল ভেতর থেকে গড়ে ওঠা কিংবা বাইরে থেকে যাওয়া একদল প্রজ্ঞাবান, ন্যায়নিষ্ঠ ও আদর্শে অবিচল উলামা। যারা তাদেরকে সংকটের সময়ে দিক-নির্দেশনা দিবে, সকল বিকৃতি ও বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু আফসোসের বিষয়, তাদের ভেতরে যেমন এই প্রকৃতির আলিম গড়ে উঠেননি (কিংবা উঠলেও সামনে আসতে দেয়া হয়নি), তেমন বাইরে থেকে যারা গিয়েছেন বা যাচ্ছেন, তারাও আকীদা ও আদর্শের ওপর অবিচল থাকছেন না, বরং সাফাইলমূলক ঐতিহ্যের স্রোতে ভেসে চলেছেন।

উদাহরস্বরূপ মওলানা আলী হাসানের কথাই ধরা যাক। তিনি বিভিন্ন স্থানে জামায়াত নিয়ে কথা বলছেন। কিন্তু সেগুলো নিতান্তই সাফাইমূলক; গঠনমূলক নয়। উদাহরণত তিনি সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, "মাওলানা মওদুদীকে আমরা আকিদার ইমামও মানি না, ফিকহের ইমামও মানি না। তিনি আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু আমাদের আকিদা হুবহু কোরআন-সুন্নাহর আকিদা।" এটি চাতুর্যপূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর দাবি। জামায়াতে ইসলামীর সম্পূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো মওদুদী রহ. এর সাহিত্যের ওপর দণ্ডায়মান। তাদের যেসব বই পড়া আবশ্যক, প্রায় সবই তাঁর লেখা। একজন ব্যক্তির লেখা সিলেবাসে রেখে, তার চিন্তাধারার ওপর কর্মীদের বড়ো করে মুখে ‘তাকে ইমাম মানি না’ বলাটা স্ববিরোধিতা। তাছাড়া মাওলানা রহ. কুরআন ও সুন্নাহর যে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন, জামায়াত সেই ব্যাখ্যাকেই হুবহু তাদের দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বানিয়েছে। কুরআনের চারটি মৌলিক পরিভাষার যে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছেন, জামায়াত আজও সেই চিন্তার ওপরই প্রতিষ্ঠিত। এরপরেও তাকে নিজেদের ইমাম স্বীকার না করা সত্যের বিকৃতি; বরং হীনস্মন্যতার পরিচয়।
তার আরেকটি দাবি, "মওদুদী সাহেবের কোনো লেখা নিয়ে যদি সমালোচনা করতে হয় তাহলে ব্যক্তি মওদুদীর করেন, দলের কেন? কারণ এই দল হুবহু ১০০% তার চিন্তা এবং তার দর্শন নিয়ে চলে বিষয়টা এমন না।" এই যুক্তিও অসার। জামায়াত মাওলানার চিন্তার ফসল। তার দর্শন বাস্তবায়নের জন্যই তিনি এই দল গঠন করেছিলেন। যতক্ষণ পর্যন্ত দলটি তার বইগুলো আঁকড়ে ধরবে, বিতর্কিত লেখাগুলো পাঠ্যতালিকা থেকে বাদ না দিবে, এবং আনুষ্ঠানিকভাবে মাওলানার বিচ্যুতিগুলোকে বিচ্যুতি আখ্যা দিয়ে সেগুলো থেকে দায়মুক্তির ঘোষণা না দিবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ‘ব্যক্তি’ ও ‘দল’কে আলাদা করা সম্ভব নয়। আর জামায়াত আজ পর্যন্ত মাওলানার কোনো ভুলের আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ করেনি বা সেগুলো বাতিল ঘোষণা করেনি। বরং তারা নিজেদের প্রকাশনী থেকে সেই বইগুলো নিয়মিত ছাপিয়ে যাচ্ছে, মাওলানার ব্যাপারে কেউ কোনো নেতিবাচক কথা বললে সমগ্র মুসলমানদের মধ্য থেকে তারাই সবার আগে ক্ষুধার্ত ব্যঘ্রের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে, এরপরেও নিজেদেরকে তার ভুল থেকে দায়মুক্ত দাবির যৌক্তিকতা থাকে না।
তার আরেকটি দাবি, "জামাতে ইসলামীর উপর যত আপত্তি, ১০০টা আপত্তির মধ্যে ৯৯.৯৯% আপত্তি হলো সেরেফ মাওলানা মওদুদীর লেখাকে কেন্দ্র করে। ...একটা পর্যায়ে দেখলাম যে আপত্তির কিছু বিষয়ে তো অবশ্যই যৌক্তিক... আর কিছু বিষয় এমন যেটা কারো বোঝার ভুল অথবা উপস্থাপনের ভুল।" এটা সচেতনভাবে আকীদাগত বিচ্যুতিকে লঘু করে উপস্থাপন। মাওলানার ব্যাপারে উলামায়ে আহলে সুন্নাহর আপত্তি ছোটখাটো আমল বা ফিকহী মাসআলা নিয়ে নয়। বরং আকীদা ও আদর্শ নিয়ে। দীনের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ঘিরে। দীনকে দেখা, বোঝা ও বাস্তবায়নের তরীকা নিয়ে। ফলে মাওলানার ব্যাপারে এমন বক্তব্য গোটা উলামায়ে আহলে সুন্নাহর ব্যাপারে বেইনসাফির অভিযোগ।
তার আরেকটি দাবি, "আমি দেখলাম তাদের গঠনতন্ত্র ইতিমধ্যে ২০১৯ পর্যন্ত সর্বশেষ ২২ বার পরিবর্তন করা হয়েছে... এ পরিবর্তন কেন? এজন্যই তো যে তারা সংশোধন হতে চান... জামাতে ইসলামের মধ্যে যে ভুল ভ্রান্তি আছে এগুলো অনেকগুলো এমন যেটা সংশোধন সম্ভব।" এটাও বাস্তবতা লুকানোর চেষ্টা। বাস্তবে গঠনতন্ত্রের পরিবর্তনগুলো মূলত প্রশাসনিক বা রাষ্ট্রীয় আইনের সাথে খাপ খাওয়ার জন্য করা হয়েছে। মাওলানার সমালোচিত আকীদা ও দলের মৌলিক আদর্শের জায়গাগুলোতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। এতে আরও প্রমাণিত হয়, তাদের কাছে আকীদার চেয়ে রাজনীতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক কারণে গঠনতন্ত্র ২২ বার পরিবর্তন করতে পারলেও দীন ও আকীদার কারণে একবারও পারেননি। ফলে ভবিষ্যতেও পারবেন এটা প্রত্যাশাও সুদূরপরাহত।
বাস্তবে এই মওলানা কিংবা এই প্রকৃতির তরুণরা এতো গুরুত্বপূর্ণ নয় যে, তাদের প্রত্যেকটি কথা বিশ্লেষণ করে মানুষকে জানাতে হবে। কিন্তু তাদের দেখাদেখি, কওমীর আরও অনেকেই জামায়াতে যোগ দিচ্ছে, সামনেও দিবে। জামায়াতে যোগদান ততোটা সমস্যাজনক নয়; যতোটা সমস্যাজনক এসব লোকের ত্রুটিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও সাফাইমূলক কর্মপদ্ধতি। তারা জামায়াতে গিয়ে যদি দলকে সংশোধন ও সুন্নাহর পথে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিতো, তবে বাইরের কারও কিছু বলার প্রয়োজন পড়তো না। কিন্তু সেটা তারা করছে না, ভবিষ্যতেও করবে বলে মনে হয় না। উল্টো তারা যেভাবে জামায়াতকে 'ব্ল্যাংক চেক' দিচ্ছে, ত্রুটিগুলোর সাফাই গাইছে, তা জামায়াতের সংশোধনের অবশিষ্ট সম্ভাবনাটুকুও বিনষ্ট করবে। এসব তরুণের সাফাইমূলক দৃষ্টিভঙ্গি আকীদার বিচ্যুতির ভয়াবহতাকে মানুষের চোখে নিতান্তই লঘু মতপার্থক্য হিসেবে দেখাবে, উলামায়ে মুখলিসীনদের প্রায় শতাব্দীকালের মেহনতে পানি ঢেলে দিবে, সর্বোপরি ভবিষৎ মুসলিহীনদের ইসলাহের কাজ কঠিনতর করে তুলবে। এটা এসব তরুণের জন্য, জামায়াতের জন্য, আমাদের সবার জন্য দুর্ভাগ্যের।


লেখক মিজান হারুন 

শেয়ার করুন
Facebook X WhatsApp Telegram LinkedIn
QR কোড স্ক্যান করে পড়ুন
বিভাগ: ইসলাম ও মুসলিম © ২০২৬ পর্যবেক্ষণ

মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

একই বিভাগের অন্যান্য লেখা

লিবারেল মুখোশের আড়ালে জামায়াত: কেন ভয়টা থেকেই যায়
ইসলাম ও মুসলিম

লিবারেল মুখোশের আড়ালে জামায়াত: কেন ভয়টা থেকেই যায়

??ামায়াতকে আমি ভয় পাই—এই কথাটা কখনও ভয়ে বলি না। ভয়টা হলো, জামায়াত যত ক্ষমতাবান হবে, তত বেশি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়বে। এবং এই…

পর্যবেক্ষণ ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
কৌশলের নামে গণতন্ত্রের ফাঁদে ইসলামপন্থীরা
ইসলাম ও মুসলিম

কৌশলের নামে গণতন্ত্রের ফাঁদে ইসলামপন্থীরা

??ুয়াড়িদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে: “The house always wins।” শেষ পর্যন্ত ক্যাসিনোই (জুয়াঘর) জিতবে। কিন্তু এই প্রচলন এবং আরও অনেক…

পর্যবেক্ষণ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
অপরিচ্ছন্ন জটাধারীদের নিয়ে ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতা
ইসলাম ও মুসলিম

অপরিচ্ছন্ন জটাধারীদের নিয়ে ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতা

??ম্প্রতি রাস্তায় অপরিচ্ছন্ন, জটাধারী কিছু লোককে ধরে তাদের জটা কেটে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দেওয়ার কিছু ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। এ…

পর্যবেক্ষণ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
↑