রোহিঙ্গা সংকট: ধর্ম, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক উদাসীনতা
প্রথম কোনও বার্মিজ মুসলিমকে দেখি ২০০৩ সালে। লাভলেইন মার্কাজে সকালের নাশতা খিচুড়ি মুখে দিতে দিতে কথা বলছিলাম। বড় ডিশ, পাঁচ জন একসঙ্গে বসেছি খেতে। আমি ছাড়া বাকি চারজন বার্মিজ। বেশিরভাগ কথাই বুঝি না। তারপরও জিজ্ঞেস করলাম, ওখানকার খবর কী? বললেন, জুলুম জুলুম। কণ্ঠটা এখনও আমার কাজে বাজে। এমনও বললেন, বিয়ে করতে হয় লুকিয়ে, না হলে আর্মি ক্যাম্প থেকে অর্ডার আসে বউকে পাঠাবার।
তারও বহু পরে ১১ সালের দিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প দেখার সুযোগ হয়। আরাকানের যুদ্ধ নিয়ে বহু গল্প শুনেছি আমরা মাদরাসায় থাকতেই। কিন্তু সত্যিকার অর্থে সবসময় আমার কাছে অস্পষ্ট ছিল যে, তাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করার আসল কারণটা কী?
সেই ঝোঁকেই গতকাল ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম রোহিঙ্গা বিষয়ক একটা সেমিনারে অংশ নিতে ‘মিয়ানমার: হোয়্যার আর উই নাউ’। ১২ দিন ধরে ওখানে রোহিঙ্গাদের নিয়ে ছবির প্রদর্শনী চলছে ‘এক খালে: ওয়ান্স আপন আ টাইম’ শিরোনামে, সেটার অংশ এই সেমিনার। সেমিনারে সামান্য ঢু মেরে দৌড় দিলাম প্রদর্শনী দেখতে। সেখানকার একজন অ্যানালিস্ট, পূর্বপরিচিত, নাম মনে নাই, দেখেই ছুটে আসলেন। সরাসরিই তার কাছে জানতে চাইলাম, ক্লিয়ারলি বলেন তো, রোহিঙ্গা মুসলিদের কেন বিতাড়িত করা হলো?
তিনি যেই উত্তর দিয়েছেন এবং ঠিক এই উত্তরই আমরা মাদরাসায় থাকতে জানি, ধর্ম। এটাই প্রধান কারণ। বললাম, আমরাও তো অমুসলিমদের সঙ্গে এই দেশে থাকি, তাতে সমস্যা কী? তিনি তখন জানালেন, সমস্যা আসলে অনেকগুলো। বার্মিজরা রোহিঙ্গাদের তাদের জাতিভুক্ত মনে করে না, বাঙালি মনে করে। কিন্তু তাতেও সমস্যা হবার কথা না, আমরা নৃ-গোষ্ঠীদের সঙ্গে থাকি না? বিষয় হলো, ওখানে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সমাজকে এমনভাবে বিষিয়ে তোলা হয়েছে যে, তারা যেন বর্বর কোন জাতি, ঊনমানুষ। আরেকটা কারণ আছে, তা হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রোহিঙ্গারা ছিল ব্রিটিশদের পক্ষে। তিনি একটা ছবিও দেখালেন, যেখানে রোহিঙ্গা কমিউনিটির লোকজন দাঁড়িয়ে আছেন, তাদের পিছনে ব্রিটিশ পতাকা উড়ছে।
গ্রেগ কনস্টানটাইনও ছিলেন প্রদর্শনী হলে, যার ছবিরই প্রদর্শনী এটা। গ্রেগ নিজে আমেরিকান। অথচ নানা দেশ ঘুরে রোহিঙ্গাদের ডকুমেন্টস কালেক্ট করছে। কৌতুহল দমন করতে না পেরে গ্রেগকে জিজ্ঞেস করলাম, কেন করছেন এসব? গ্রেগের জবান খুলে গেছে মনে হলো। এমনিতেও তিনি কথা বলতে ভালোবাসেন, নিজেই সেটা বেশ কয়েকবার বললেন। পুরো হলটা নিজে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন। ছবি কোনটা কখন কীভাবে পেয়েছেন, কত থ্রিল একেকটা ছবির পিছনে, অনর্গল বলতে থাকলেন। ইভেন ফান্ড পাচ্ছেন না, তাকে হিস্টোরি গবেষণা জনরায় ফান্ড দেওয়া হচ্ছে, মানবিক সহায়তা বা আইনি সহায়তার জন্য গবেষণা করছেন, সেজন্য না। তাকে বার্মিজ সৈন্যরা থ্রেট দিয়েছে, এমনকি ব্লাকলিস্টেড করে রেখেছে সে-দেশে আর ঢুকতে না পারে, সেটাও জানালেন।
গ্রেগকেও একই প্রশ্ন করলাম, ওখানে সমস্যাটা কী, কেন তাদের বের করে দেওয়া হচ্ছে? তিনিও জানালেন, আসল কারণ ধর্ম। তা ছাড়া জাপানিদের পক্ষ না নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তারা ব্রিটিশদের পক্ষে থাকায় বার্মিজরা তাদের মনে করে রাজাকার। তিনি জানালেন কীভাবে আবদুস সালাম নামের সেকালের রোহিঙ্গা নেতার ছবি পেয়েছেন, যাকে ব্রিটিশরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সম্মাননা দিয়েছে; যার ছেলে-মেয়েরা এখন ব্রিটেনেই বসবাস করে।
আমি সেই অ্যানালিস্ট এবং গ্রেগ দুজনকেই জিজ্ঞেস করলাম, এমনকি ব্যারিস্টার মনজুর হাসান স্যারকেও (ওবিই), যে, একচুয়াল সমাধান কী রোহিঙ্গা সমস্যার। সত্যি কথা হলো, তারা কেউই জানেন না সমাধানটা কী। গ্রেগ তো স্পষ্ট বললেন, আমি কোনও সমাধান দেখি না। অ্যানালিস্ট বললেন, মিলিটারি সমাধান কাজ করবে না। এখন বিশ্ব নানান কনফ্লিক্টে ব্যস্ত, ইউক্রেন, গাজা, আফ্রিকার মতো নানান ফাঁদে আটকে গেছে। আমেরিকা রোহিঙ্গাদের থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছে। সমাধান যখন করার সময় যখন ছিল, তখন আমরা নোবেলের জন্য মুখিয়ে ছিলাম, সমাধান না করে। এখন সময় পার হয়ে গেছে।
এখন একমাত্র হতে পারে, বার্মিজ সরকারকে কোনও একটা বেনিফিট দেখানো যে, এক-দুই হাজার করে রোহিঙ্গা রিপ্যাট্রিয়েট করবে তারা, বিনিময়ে এই এই সুবিধা তাদের দেব, যেই সুবিধাগুলো আবার আমরা আন্তর্জাতিক কমিউনিটিকে ম্যানেজ করে যোগাড় করব। তাদের জোর করে পাঠানো হলে উল্টা রোহিঙ্গারা আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে আন্তর্জাতিক আদালতে, কারণ ওখানে গিয়ে তারা নিপীড়নের মুখে পড়বে।
একটা জিনিস প্রদর্শনী ঘুরে ঘুরে বুঝলাম, রোঙ্গিদের পূর্বসূরিতের কোথাও বাঙালি চিহ্ন নাই, বরং তারা বহু আগে থেকেই নিজেদের বার্মিজ বা বার্মার মুসলিম বলে গর্ব করে। তাদের বহু পুরাতন পাসপোর্ট, পূর্বসূরিদের ছবি, নাগরিক সনদ এবং অন্যান্য ডকুমেন্ট সব কিছু বার্মিজ। প্রদর্শনীর নাম ‘এক খালে’ মানে ‘এক কালে’ আর কি, মানে কোনও এক সময়, আসলে সবসময়ই তারা বার্মিজ।
১২ দিন ধরে ঢাকায় এমন একটা প্রদর্শনী হলো, আজ অবশ্য শেষ দিন, খুব বেশি আওয়াজ শুনলাম না। গিয়ে এত ভালো লেগেছে যে, বা বলা যায়, এত মন খারাপ হয়েছে কী বলব। শাহরিয়ার সাদাত স্যারকে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা, স্যার বারবার মেসেজ করে বলছিলেন যেতে।
লেখক মনযূরুল হক