আফগানিস্তান: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি নতুন অধ্যায়?
সূচিপত্র
আফগানিস্তান: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি নতুন অধ্যায়?
আফগানিস্তানের কাবুল চার বছর পনেরো দিন আগে ন্যাটোর হাত থেকে তালিবানের হাতে ফিরে যায়। বিশ বছরের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটিয়ে পুনরায় তাঁরা সেদিন কাবুলের সিংহাসনে ফিরে আসে।
আফগানিস্তানের ওপর U.S. Department of Defense (DoD) যে বাহিনী নিয়ে হামলা করেছিল, পৃথিবীর অমন পার্থিব শক্তিধর বাহিনী আর কখনো চোখে দেখেনি। অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর দুই দশকের অর্জন সেদিন মাত্র নয় দিনে ধুলোয় মিশে গেলো— নিমরূজ, হিরাত, কান্দাহার, মাজার-ঈ-শরীফ। যেন দিগন্তের ওপার থেকে আপতিত হওয়া বিধ্বংসী মরুঝড়। পলক ফেলার আগেই পৌঁছে গেলো কাবুল শহরের হৃদয়ে!
Chris Miller, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক Secretary of Defense, এর সুন্দর বর্ণনা দিয়েছিলেন। তাঁর নিজের ভাষায় তখনকার সময়ে কাবুলের পরিস্থিতি নিম্নে সংযুক্ত করা হলো—
"তেরো তারিখের কথা বলছি আমি। দিনটা ছিল শুক্রবার। সকালে ঘুম ভাঙার পর আমি খবর চালু করলাম। সাথে সাথে আমার কানে রিপোর্টারের কন্ঠস্বর ভেসে এলো।— 'তালিবান যোদ্ধারা কাবুল শহরের উপকন্ঠে সমবেত হতে আরম্ভ করেছে।'কথাটা শোনার সাথে সাথে আমার মাঝে কাবুলের দক্ষিণে অবস্থিত একটি চত্বরের চিত্র ভেসে উঠতে লাগলো। আমরা যখন অপারেশন শেষে সড়কপথে কাবুলে আগমন করতাম বা অপারেশনের জন্য শহর ছেড়ে বের হতাম, চত্বরটি সবসময় আমাদের Rally Point হিসাবে ব্যবহৃত হতো।আমার চোখে তখন চত্বরটির চিত্র ভাসতে শুরু করলো। আমি দেখছিলাম— চত্বরের শুরু থেকে দিগন্তসীমা পর্যন্ত তালিবান যোদ্ধাদের কনভয় অপেক্ষমান অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর দিগন্তের দূর দূরান্ত পর্যন্ত গর্বিত ভঙ্গিতে উড়ে চলছে তাঁদের কনভয়ের ওপর উড়িয়ে দেওয়া অগণিত সাদা আর কালো পতাকা!"
ফিরে আসি আমার কাছে। সেদিন আমি খুব মনোযোগের সাথে আফগানিস্তান পর্যবেক্ষণ করছিলাম। Military Assistance Command Vietnam - Studies & Observation Group নিয়ে আমার চরম আগ্রহ থাকায় আমি পূর্বে ভিয়েতনামে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ ও তাঁদের পতন নিয়ে অল্প পড়াশোনা করেছিলাম। ফলে কোথাও কোনো গেরিলা বাহিনী বিজয় লাভ করলে কী হয়, তা সম্পর্কে আমার সামান্য ধারণা ছিল।
শোনা যায় যে, সায়গনের যেদিন পতন হলো, সেদিন North Vietnamese Army (NVA) সায়গনে ঢোকার পর শহরের রাস্তার পার্শ্ববর্তী গাছ ও সড়কের সমস্ত ল্যাম্পপোস্ট ফাঁসির মঞ্চে পরিণত হয়েছিল। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে অগণিত মানুষকে ধরে সেদিন রাস্তায়, অলিতে-গলিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। মানুষ কোনো পথ না পেয়ে ডিঙিতে চড়ে সাগর পাড়ি দিয়ে পালানোর পথ বেছে নিয়েছিল।
কিন্তু আমাকে অবাক হতে হলো। তালিবানদের কাবুলে আগমন হয়েছিল প্রচণ্ড প্রভাবশালী ভঙ্গিতে। Sky News এর একটি রিপোর্টের কথা এখনো স্মরণে আছে আমার। যেখানে তাঁদের রিপোর্টার হোটেলের নিজস্ব রুমে বসে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন। তাঁর কথার মাঝখানে বহুদূর থেকে গুরুগম্ভীর গর্জনের অনুরূপ আওয়াজ ভেসে আসতে শুরু করলো। নিজ কানে না শুনতে পারলে আসলে তার বিবরণ লিখে দেওয়া মুশকিল।
রিপোর্টার খানিকটা বিরতি নিয়ে হেসে দিয়ে জানাতে শুরু করলেন—
"সম্ভবত আপনারা শুনতে পারছেন আশা করি। তাঁরা হলো তালিবান। এখন যাঁরা কিনা কাবুল শহরে মার্চ করছে।"
তাঁদের প্রভাব কেমন পড়েছিল সেখানে যে, শহরের বাইরে তালিবানের পতাকা উড়তে দেখে সেদিন শহরের সমস্ত নিরাপত্তা বাহিনীর ঘাঁটি ও ডিফেন্সিভ পজিশনে ডেপ্লয়েড থাকা মার্কিন সামরিক বাহিনীর দ্বারা সমর্থিত আফগানরা কোনো রাউন্ড ফায়ার না করে নিজেদের পোশাক খুলে অস্ত্র ফেলে পালিয়ে যেতে শুরু করে!
ওদের সকলের চিন্তা তখন বিমানবন্দরে গিয়ে মার্কিনীদের সাথে দেশ ছাড়া। সকলের মাথায় তখন ঘুরছে দ্বিতীয় সায়গনের চিত্র।
ঠিক অমন সময়ে সাধারণ ক্ষমা ঘোষিত হলো। নিরাপত্তা বাহিনীর পলায়নের খবর শুনে তালিবান শহরে ঢুকে নিরাপত্তার দায়িত্ব হাতে নিলো। তারপর সেদিন হতে আজ পর্যন্ত কিছু সন্ত্রাসী হামলা ও ভূমিকম্প, বন্যার মতো দুর্যোগ ছাড়া আফগানদের নিজ দেশের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হয়নি।
কোথাও ডাকাতি হয় না, কোথাও খুন হয় না। খুন হলে সাথে সাথে Afghan National Police (ANP) প্রস্তুত থাকে। মুহূর্তের মাঝে বন্দি করে ফেলে। তারপর অপরাধের বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে গেলে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রস্তুত।
দারিদ্র্য আর যুদ্ধের ফলে দেশের ভঙ্গুর অবস্থার কারণে শহরাঞ্চলে যদিও বর্তমান সময় পর্যন্ত ছোটখাটো নানান অপরাধ সংঘটন হয়ে থাকে, তবে তাও ধীরে ধীরে কমে আসছে।
বস্তায় করে ধারালো অস্ত্র নিয়ে দল বেঁধে আফগান নাগরিকদের ওপর আঘাত করা সম্ভব হয় না। পাথর নিক্ষেপ করে নিরপরাধ মানুষকে আজ পর্যন্ত জনসমক্ষে আঘাত করা সম্ভব হয়নি। ধর্ষণ করে সেখানে নিরাপদ থাকার মতো সাহস কারো হয় না।
তাঁদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কখনো "Situation out of our hands" মর্মে বিবৃতি জারি করে না।

