রাজনীতি ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ⏱ ৬ মিনিট পড়া

চাকমা সম্প্রদায়, মুক্তিযুদ্ধ ও ১৭ আগস্টের কালো দিবসের প্রশ্ন

প্রকাশক — পর্যবেক্ষণ
চাকমা সম্প্রদায়, মুক্তিযুদ্ধ ও ১৭ আগস্টের কালো দিবসের প্রশ্ন


ডাকসু নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত এক মহিলা প্রার্থীর একটি বক্তব্য থেকে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একটি টিভি চ্যানেল আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, একাত্তরের চাকমাদের কোনো স্টেক ছিল না। বিতর্কটা তিনি যেখানে দাঁড়িয়ে করেছেন, তাতে বলা যায়—কাঁচের ঘরে বসে তিনি ঢিল ছুঁড়েছেন। আমার মতে, শিবির প্যানেল থেকে অন্তত এই বিতর্ক উসকে দেওয়া ঠিক হয়নি। কেননা এখন যখন চারিদিক থেকে পাল্টা ঢিল আসছে, তা শিবিরের কাঁচের দেয়ালই অধিক ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এর আগের একটি লেখায় বলেছিলাম—এরা সারামাঠ ভালো খেলে কিন্তু গোলপোস্টের সামনে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। জামাত ও শিবিরের ক্ষতি তারা নিজেরাই করে। এর আগে যখন টিএসসিতে যুদ্ধাপরাধীদের নামে স্লোগান দিয়েছিল এবং তাদের ছবি টাঙিয়েছিল শিবির, তখনই বলেছিলাম এর প্রভাব নির্বাচনে পড়বে। এখন তারা সেটি টের পাচ্ছে।



একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর শতভাগ কখনোই একপথে পরিচালিত হয় না। সব বাঙালি যেমন মুক্তিযোদ্ধা নয়, ঠিক তেমনি সব পাহাড়ি রাজাকার নয়। বাঙালিদের মধ্যে যেমন রাজাকার ছিল, তেমনি পাহাড়িদের মধ্যেও বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এমনকি আলোচিত চাকমা সম্প্রদায়ের মধ্যেও অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর তুলনায় চাকমাদের ভেতর থেকেই সবচেয়ে বেশি রাজাকার বা মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী ছিল। এটা সম্ভবত তাদের সার্কেল চিফ ত্রিদিব রায়ের প্রভাবের কারণে। তাই বলে সমগ্র চাকমা সম্প্রদায়কে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বলা সংগত নয় এবং এটা ইতিহাসবিরুদ্ধও বটে।



তবে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরে আমি অতীতের চেয়ে ভবিষ্যতমুখী বেশি হতে চাই। সেজন্য আমার কাছে আজকের অবস্থান সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ডাকসু নির্বাচনের এক চাকমা ছাত্রীকে দেখলাম বলছেন, এখন চাকমা সম্প্রদায়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে কেউ নেই। কথাটা মানতে পারলে তার এই কথায় আমি খুশি হতাম।

কেননা আমি দেখতে পাচ্ছি—১৯৪৭ সালের ১৭ই আগস্ট পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ব পাকিস্তান রূপে বাংলাদেশের আজকের ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এই সংযুক্তি তারা তখনও মেনে নিতে পারেননি। ফলে রাঙ্গামাটিতে চাকমা নেতৃবৃন্দ ভারতের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। ২০ আগস্ট ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস রাঙ্গামাটিতে প্রবেশ করে ভারতীয় পতাকা নামিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করে। এর মধ্যে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম সেকালে পূর্ব পাকিস্তান এবং আজকের বাংলাদেশের সাথে সংযুক্ত হয়। কিন্তু এই সংযুক্তি তারা সেদিন মেনে নিতে পারেননি এবং আজও কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। তাই আজও ১৭ই আগস্টকে ব্ল্যাক ডে বা কালো দিবস রূপে পালন করে থাকে বাংলাদেশ ও ভারতের চাকমা সম্প্রদায়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।



পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশভুক্তির প্রতিবাদে ১৭ আগস্টকে ব্ল্যাক ডে পালন করা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। ১৭ আগস্ট ব্ল্যাক ডে পালন করে নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের স্টেকহোল্ডার দাবি করা যায় না। কাজেই সকল চাকমাই যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে, এই তথ্যটি সঠিক নয়। আবার এটাও সঠিক নয় যে সকল চাকমাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে। তবে ডাকসুর মতো নির্বাচনে এই অতীতনির্ভর বিতর্ক কতটা সঙ্গত—সে প্রশ্নও তোলা যায়।

বাঙালিদের মধ্যে যেমন গোলাম আযম ছিলেন, পাহাড়িদের মধ্যে তেমনি ত্রিদিব রায় ছিলেন। বাঙালি রাজাকারদের শিরোমনি ছিলেন গোলাম আযম, পাহাড়ি রাজাকারদের শিরোমনি ছিলেন ত্রিদিব রায়। গোলাম আযম তবুও স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন, বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন, রাজনীতি করেছেন। বিতর্কিত হলেও একটি বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি তার জীবন সমাপ্ত করেছেন। কিন্তু তার দাফন বাংলাদেশেই হয়েছে। তিনি যেমন চাইলেই পাকিস্তানে থেকে যেতে পারতেন, তেমনি তার লাশ পাকিস্তানে দাফনের ওসিয়তও করে যেতে পারতেন। কিন্তু তেমন কিছুই করেননি। মৃত্যুর পর তার পরিবার দেশেই তার লাশ দাফন করেছে।



অন্যদিকে ত্রিদিব রায় পাকিস্তানে যাওয়ার পর বাংলাদেশে আর ফিরে আসেননি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রাপ্তির বিরোধিতা করেছিলেন পাকিস্তানের হয়ে। বাংলাদেশ সরকার তাকে ফিরিয়ে আনতে এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের বিরোধিতা না করতে তার মা বিনীতা রায়কে পাঠায়। কিন্তু ত্রিদিব রায় বাংলাদেশ সরকার ও নিজের মায়ের অনুরোধ উপেক্ষা করে বাংলাদেশের বিরোধিতা না করা এবং বাংলাদেশে ফিরে আসার দুটো প্রস্তাবই ঘৃণাভরে ফিরিয়ে দেন। সেখান থেকে তিনি আবার পাকিস্তানেই চলে যান এবং আমৃত্যু পাকিস্তানে থাকার অভিলাষ ব্যক্ত করেন। ফলে স্বদেশের প্রতি তার এই বিরোধিতাকে মূল্যায়ন করে পাকিস্তান সরকার তাকে আমৃত্যু পাকিস্তানে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় রেখে সম্মানিত করে। মৃত্যুর পর তার লাশ যেন বাংলাদেশে না আনা হয়—এ ব্যাপারে তিনি বিশেষভাবে ওসিয়ত করে যান। ফলে তার সন্তানরা চেষ্টা করেও পিতার লাশ দেশে ফেরাতে পারেনি।

এই দুটো ঘটনা থেকে কারো মনে একটি তুলনামূলক বিচার আসতে পারে—কে বড় রাজাকার?

আমি সবসময় বলেছি, এই বাংলা যেমন গোলাম আযমের নয়, তেমনি এই বাংলা ত্রিদিব রায়েরও নয়। ত্রিদিব রায় ও গোলাম আযমদের পরাজিত করেই এই বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। কিন্তু আজকের প্রজন্মের আলোচনা ও বিতর্কের মুখ্য বিষয়বস্তু এটা হওয়া উচিত নয়। অবশ্যই ’৭১ আমাদের চেতনায় ও মননে নির্দেশক হিসেবে উপস্থিত। কিন্তু যারা গলায় একাত্তরের তাবিজ, বাহুতে একাত্তরের বাজুবন্ধ, কোমরে একাত্তরের বিছা, গায়ে একাত্তরের জামা, হাতে একাত্তরের লাঠি, মুখে একাত্তরের জিকির করে বেড়ান—তাদের পকেটে মূলত একাত্তরের নোট (মুদ্রা)।

এরা আপনাকে স্বয়নে, স্বপনে, জাগরণে একাত্তরকে স্মরণ করাবে এবং পরের লাইনেই বলবে একাত্তরে ভারতীয়দের অবদান। মূলত এই বয়ান আপনার মস্তিষ্কে গেঁথে দেওয়ার জন্যই এভাবে সারাক্ষণ একাত্তরের তসবিহ পাঠ করানো হয়। কিন্তু এই অতীতমুখী আলোচনা ও বিতর্কে জড়িয়ে আমরা ভবিষ্যতমুখী আলোচনার পথে এগোতে পারি না।

বিশ্বে অনেক দেশ স্বাধীন হয়েছে, অনেকে এভাবে যুদ্ধ করেই স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু তারা কেউ সারাক্ষণ স্বাধীনতার চেতনার নামাবলি গায়ে জড়িয়ে স্বাধীনতা-স্বাধীনতা জপ করে না। পার্শ্ববর্তী ভারত ও পাকিস্তানকে ’৪৭-এর চেতনা সারাক্ষণ জিকির করতে শোনা যায় না। কিন্তু বাংলাদেশে ’৭১-কে কাউন্টার করতে অনেকেই ’৪৭-কে দাঁড় করাতে চান। অথচ ’৪৭-এর পথ ধরেই এসেছে ’৭১। কিন্তু এই বিতর্ক কাম্য নয়।

আমাদের তরুণ সমাজ—ডাকসুর প্রার্থীরা যারা আগামী দিনে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে—তারা আগামী বাংলাদেশের রূপরেখা, লক্ষ্য, চাহিদা ও স্বপ্ন নিয়ে কথা বলবে, সেটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।


লেখক: মেহেদি হাসান পলাশ

শেয়ার করুন
Facebook X WhatsApp Telegram LinkedIn
QR কোড স্ক্যান করে পড়ুন
বিভাগ: রাজনীতি © ২০২৬ পর্যবেক্ষণ

মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

একই বিভাগের অন্যান্য লেখা

এপস্টিন ফাইলের রাজনীতি: সত্যের প্রকাশ নাকি কৌশলগত ফাঁস
রাজনীতি

এপস্টিন ফাইলের রাজনীতি: সত্যের প্রকাশ নাকি কৌশলগত ফাঁস

এপস্টিন ফাইলের রাজনীতি : সত্যের প্রকাশ নাকি কৌশলগত ফাঁস এপস্টিন ফাইল আবার আলোচনায়। বলা হচ্ছে — অবশেষে সত্য বেরিয়ে আসছে। কিন্তু ইতিহাস জানে…

পর্যবেক্ষণ ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
দেওবন্দি ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে জামায়াতি প্রোপাগান্ডা: ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ
রাজনীতি

দেওবন্দি ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে জামায়াতি প্রোপাগান্ডা: ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ

??োবর পচলে সার হয়, কিন্তু জাশি পচলে ল্যাটকা গু হয়। এ যাবৎ যতটা এক্স জাশি দেখলাম, সবাইকেই হাফ শাহবাগি হতে দেখলাম। খোমেনি ইহসান নামের এক্স…

পর্যবেক্ষণ ১৩ অক্টোবর ২০২৫
হোচিমিন রোকন ও কৃষ্ণচূড়া বিতর্ক: বিএনপির নীতিগত অবস্থান কোথায়?
রাজনীতি

হোচিমিন রোকন ও কৃষ্ণচূড়া বিতর্ক: বিএনপির নীতিগত অবস্থান কোথায়?

??িএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে দেখা গেছে হোচিমিন রোকনসহ বেশ কজন যৌনবিকৃতি লালনকারী কিছু লোকের সাথে একটি…

পর্যবেক্ষণ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
↑