পার্বত্য চট্টগ্রাম ২০ আগস্ট ২০২৫ ⏱ ৩ মিনিট পড়া

পর্যটন বনাম সম্প্রসারণবাদ: চন্দ্রনাথ পাহাড়ের সংকট

প্রকাশক — পর্যবেক্ষণ
পর্যটন বনাম সম্প্রসারণবাদ: চন্দ্রনাথ পাহাড়ের সংকট

 

  • পর্যটন বনাম সম্প্রসারণবাদ: চন্দ্রনাথ পাহাড়ের সংকট


  • দিল্লির আজমির শরীফ, অমৃতসরের স্বর্ণ মন্দির, ভ্যাটিকান সিটির সেন্ট পিটার্স বাসিলিকা, কিয়োটোতে অবস্থিত জাপানের কিয়োমিজু-দেরা মন্দির— এসব আধ্যাত্মিক তীর্থস্থানের দরজা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে নানা জাতি-পেশা-ধর্ম-বর্ণের মানুষ এখানে ভ্রমণ করে, ইতিহাসের পাতা ছুঁয়ে দেখে, নান্দনিক স্থাপত্যের মাহাত্ম্য অনুভব করে, সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধিকে সচক্ষে অবলোকন করে।

    • দিল্লির আজমির শরীফে প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ ভ্রমণপিয়াসী দর্শনার্থীর ভিড় জমে, যার মাধ্যমে বাৎসরিক আয় হয় প্রায় ৬০ কোটি টাকা।

    • অমৃতসরের স্বর্ণ মন্দিরে প্রবেশ করে বছরে ৩০–৩৫ মিলিয়ন মানুষ, যার মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।

    • ইউরোপে ভ্যাটিকান সিটির সেন্ট পিটার্স বাসিলিকা ৬.৮ মিলিয়ন পর্যটককে আকৃষ্ট করে, যার মাধ্যমে বাৎসরিক প্রায় ৮০ মিলিয়ন ইউরো উপার্জিত হয়।

    • জাপানে কিয়োটোর কিয়োমিজু-দেরা মন্দির ভ্রমণে আসে বছরে প্রায় ৪৩ মিলিয়ন দর্শনার্থী, আয় হয় প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৮১.৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

    অথচ, চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ক্ষেত্রে হঠাৎ করেই ভিন্ন এক সুর বাজছে— গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকদের মতো অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠায় ওয়াদাবদ্ধ বিচ্ছিন্নতাবাদী লোকদের পক্ষ থেকে এখানে অসনাতনিদের প্রবেশাধিকারের প্রশ্নে বিতর্ক তৈরি করার প্রচেষ্টা দেখা যায়।

    কেন এই বৈপরীত্য?
    সত্যিই কি এটি পবিত্রতা রক্ষার প্রশ্ন? নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর ভূরাজনৈতিক ষড়যন্ত্র?

    চন্দ্রনাথ পাহাড়কে ঘিরে হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষ থেকে যে আখ্যান দাঁড় করানো হয়েছে, তা নিছক কোনো বানোয়াট আধ্যাত্মিক ইতিহাস নয়, বরং এটি ভারতের এক সুপরিকল্পিত সম্প্রসারণবাদী প্রকল্প। প্রথমে রটানো হয় কল্পিত পৌরাণিক কাহিনী, তারপর তাকে প্রমাণিত ইতিহাসে রূপান্তরের চেষ্টা চলে। “প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ” আবিষ্কারের দাবি তোলা হয় এবং শেষে বিশাল মন্দির নির্মাণ করে পুরো অঞ্চলকে "ঐশ্বরিক স্থাপনা" হিসেবে ঘোষণা দিয়ে স্থায়ী দখলদারিত্ব কায়েম করা হয়। এটাই দিল্লির হিন্দুত্ববাদী আধিপত্য বিস্তারের সেই নোংরা নকশা— যার সাক্ষী স্বয়ং হিন্দুত্ব*বাদীদের আগ্রাসনে শহীদ হওয়া আমাদের বাবরী মসজিদ; যেখানে মিথ্যাকে সত্যের আসনে বসিয়ে ইতিহাসকে জালিয়াতির মোড়কে ঢেকে দিয়ে ভূখণ্ডের মালিকানা দাবি করা হয়েছিল রাম মন্দির প্রতিষ্ঠায়।

    বাস্তবতা হলো— চন্দ্রনাথ পাহাড় কেবল একটি আধ্যাত্মিক উপাসনা কেন্দ্র নয়, বরং দেশীয় হিন্দুত্ববাদীদের কৌশলগত ঘাঁটি। এখান থেকেই তারা অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠায় ‘সেভেন সিস্টার্স’-এর সাথে ভার*তের মূল ভূখণ্ডকে সংযুক্ত করতে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগলিক অখণ্ডতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারের স্বপ্ন বুনছে। তাদের দৃষ্টিতে এটি নিছক ধর্মীয় স্থান নয়, এটি দিল্লির পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অখণ্ডতা হরণের ভূরাজনৈতিক প্রকল্পের প্রতি তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন।

    রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে প্রশ্ন হলো— এই পাহাড়কে কেন গেরুয়া সম্প্রসারণবাদের কব্জায় সঁপে দিয়ে দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া হবে? কেন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার মাধ্যমে পর্যটন শিল্পকে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করা থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করা হবে? পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মীয় তীর্থস্থান যেখানে ইউনেস্কোর মাধ্যমে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের স্বীকৃতি পেয়ে বৈশ্বিক পর্যটনশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে, সেখানে চন্দ্রনাথ পাহাড়কে হিন্দুত্ব*বাদী সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার বেড়াজালে আবদ্ধ করে রাখা হবে?

    চন্দ্রনাথ পাহাড় প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও ভৌগলিক অখণ্ডতার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে; যা ইতিহাস ও প্রকৃতির এক বিচিত্র সম্মিলনে বৈদেশিক মুদ্রার অবাধ স্রোত সৃষ্টিতে আমাদের পর্যটন শিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠতে পারে; স্থানীয় অর্থনীতি প্রাণ ফিরে পেতে পারে। সুতরাং, ধর্মীয় সংকীর্ণতার মুখোশ ছিঁড়ে এই পাহাড়কে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের পর্যটন ও ভূরাজনীতির শক্তির প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

    লেখক: আবু উসামা

    শেয়ার করুন
    Facebook X WhatsApp Telegram LinkedIn
    QR কোড স্ক্যান করে পড়ুন
    বিভাগ: পার্বত্য চট্টগ্রাম © ২০২৬ পর্যবেক্ষণ

    মন্তব্য (০)

    এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

    মন্তব্য করুন

    মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

    একই বিভাগের অন্যান্য লেখা

    চন্দ্রনাথ পাহাড় ইস্যু: রাষ্ট্রীয় নীতির আড়ালে কার স্বার্থ পূরণ হচ্ছে?
    পার্বত্য চট্টগ্রাম

    চন্দ্রনাথ পাহাড় ইস্যু: রাষ্ট্রীয় নীতির আড়ালে কার স্বার্থ পূরণ হচ্ছে?

    ??ন্দ্রনাথ পাহাড় ও রাষ্ট্রের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত চন্দ্রনাথ পাহাড়কে ঘিরে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নিছক কোনো অসাম্প্রদায়িক প্রশাসনিক…

    পর্যবেক্ষণ ২৮ আগস্ট ২০২৫
    গণতন্ত্রের নামে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের পুনর্বাসন
    পার্বত্য চট্টগ্রাম

    গণতন্ত্রের নামে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের পুনর্বাসন

    ??াকসু নির্বাচনে হিন্দু ধর্মাবলম্বী প্রার্থীর সংখ্যা কমেছে, তবে ট্রাইবাল প্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। ট্রাইবাল প্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি ইতিবাচক…

    পর্যবেক্ষণ ২১ আগস্ট ২০২৫
    চট্টগ্রামকে ঘিরে হিন্দুত্ববাদী পরিকল্পনা ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা
    পার্বত্য চট্টগ্রাম

    চট্টগ্রামকে ঘিরে হিন্দুত্ববাদী পরিকল্পনা ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা

    ??উনুস সরকারের পক্ষে ছিলো জেনজি সম্প্রদায়। জেনজি মানে ছাত্র ও তরুণরা। যাদের জন্ম আনুমানিক ১৯৯৭–২০১২ সালের মধ্যে। Gen Z সম্পর্কে কথিত আছে…

    পর্যবেক্ষণ ২০ আগস্ট ২০২৫
    ↑