হিজাব–নিকাব : স্বাধীন দেশে নিষিদ্ধ পোশাক?
ভিকারুননিসায় পড়াকালীন একদিন হঠাৎ সব ক্লাসের কয়েকজন মেয়েকে অপরাধীর মতো দাঁড় করিয়ে লাইন ধরে বড় আপার রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। বড় আপা ছিলেন তখনকার সবচেয়ে ভয়ংকর চরিত্র। সাধারণত অপরাধীদের সেখানেই বিচার হতো। কিন্তু সেদিন অপরাধ ছিল—হিজাব ঠিকমতো না পড়া। আমাদের বলা হলো, হিজাব হতে হবে ছোট, গলা দেখা যেতে হবে, শুধু মাথাটুকু ঢাকাই যথেষ্ট।
আইডি কার্ডের ছবিতেও হিজাব মানা হয়নি। বাধ্য হয়ে দ্বিতীয়বার ছবি জমা দিতে হলো। ক্লাস টেন পর্যন্ত নিয়ম ছিল—চুলে তেল দিয়ে মাঝখানে সিঁথি করে বেণী করতে হবে। আমার ছোট চুল দেখে এক টিচার হিজাব খুলে চেক করলেন তেল আছে কিনা! হিজাব আমার পোশাক, অথচ সেটি অন্যের ইচ্ছায় খোলা হলো।
রাজউকে এসে প্রথম দিনেই হিজাব বা বোরকা পরিহিতার নিকনেম হয়ে গেল “হুজুর”। পড়াশোনায় একটু পিছিয়ে পড়লে শুনতে হতো—“খালি হিজাব পড়লেই হবে?” দেরি করে ক্লাসে গেলে বলা হতো—“এত রঙঢঙ করলে তো দেরি হবেই।” অথচ হিজাবের রঙ বা ধরন নিয়ে সত্যিই কোনো সম্পর্ক ছিল না।
ক্লাস শেষে টিচাররা ডেকে বলতেন, “এটা কোনো হিজাব পড়ার ধরন হলো?”। এক সহপাঠী বোরকা পড়ার অনুমতি চাইলে মর্নিং শিফটের ভিপি স্যার বললেন—“পর্দা করার জন্য মাদ্রাসা আছে, ওখানে ভর্তি হও, এটা রাজউক কলেজ।” আরেক পরীক্ষায় নিকাব পরা একটি মেয়েকে একজন কেমিস্ট্রি প্রফেসর জোর করে নিকাব খুলতে বাধ্য করলেন এই বলে—“তোমার চেহারা না দেখলে পরের বার চিনব কীভাবে?”।
একজন হিন্দু মিস, যিনি একসময় বন্ধুসুলভ ছিলেন, ক্ষমতায় গিয়ে প্রতিদিন নিকাব নিয়ে অপমান করতেন। “যথেষ্ট ছোট না” হওয়াই ছিল তার অভিযোগ। প্রকাশ্যে চড় দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন।
মজার ব্যাপার হলো, কলেজের টেইলর জুতা থেকে জামা—সব বিক্রি করতেন, শুধু হিজাব-নিকাব নয়।
এই টানাপোড়েনে ৮ বছর কাটিয়েছি ভয়ে-ভয়ে। অপমান, উপহাস, অকারণ বিচার—সব সয়ে গেছি। কিন্তু এসব অন্যায় ভুলে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
আমরা ভুলিনি—
-
ইথিকার মৃত্যু কীভাবে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল।
-
কোচিং না করার কারণে কেমিস্ট্রি আর ইংরেজি টিচাররা মার্কস নিয়ে কীভাবে ত্যানাপ্যাঁচ করেছে।
-
ধর্মীয় শিক্ষার শিক্ষকরা কেন প্রতিবাদ করেননি, প্রশ্ন তোলেননি।
-
প্রতিদিনের গালিগালাজ, অপমান আর হিজাব-নিকাব বিদ্বেষ।
আমরা সব মনে রেখেছি। হৃদয়ের ক্ষত শুকায়নি।
