মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আর ফজলুর রহমানের গল্প
—একজন অনুসন্ধানীর চোখে
ফজলুর রহমানের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রক্ত গরম করা বক্তব্যে বিএনপি উল্লসিত হয়, কিন্তু আমার মনে জন্ম নেয় সংশয়। তাই খুঁজতে বসি তাঁর বীরত্বের ইতিহাস। আর যা পেলাম, তা একেবারেই বিস্ময়কর।
গত ৯ ডিসেম্বর একাত্তর টিভিতে প্রচারিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণমূলক অনুষ্ঠানে ফজলুর রহমান জানান, তিনি নাকি ৯ মার্চ কিশোরগঞ্জে পতাকা উত্তোলন করেন। ১১ মার্চ ইটনা থানায় গিয়ে ওসিসহ পুলিশদের জিম্মি করে অস্ত্র জমা দিতে বাধ্য করেন। সেই অস্ত্র দিয়ে আনসার কমান্ডারদের নেতৃত্বে প্রায় ২০০-২৫০ ছাত্রকে প্রশিক্ষণও দেন।
২৬ মার্চে যখন তিনি শোনেন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে, তখন তিনি ইতোমধ্যেই একটি থানা দখল, অস্ত্র উদ্ধার এবং শতাধিক যোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ফেলেছেন—এমন দাবিই করেছেন। অথচ আশ্চর্য, সেই সময়কার কোন সংবাদপত্র, কিংবা “বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ”-এর কোন খণ্ডে এই ঘটনার উল্লেখ নেই।
বরং “বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ”-এর ১ম খণ্ড বলছে, ইটনা থানা আক্রমণ হয়েছে ১৯৭১ সালের ১৫ নভেম্বর। মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান ঠাকুরের নেতৃত্বে ৪টি দল সেই আক্রমণে অংশ নেয়। সেখানে কোথাও ফজলুর রহমানের নাম নেই।
তিনি আরও বলেন, মেজর মীর শওকত আলীর নেতৃত্বে জাফলং ও তামাবিল সীমান্তে যুদ্ধে অংশ নেন। অথচ জেনারেল মীর শওকত আলীর লেখা “The Evidence 2: The Liberation War Sector-5” বইতে তাঁর নাম নেই।
করিমগঞ্জ থানা মুক্ত হওয়ার কৃতিত্বও তিনি নিজের নামে দাবি করেন। কিন্তু “বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ”-এর ২য় খণ্ডে করিমগঞ্জ মুক্তির ইতিহাসে তাঁর নাম একবারও ওঠেনি।
৯ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর কালনী-কুশিয়ারা যুদ্ধে নাকি তিনি তিনজনকে নিয়ে ১৭৯ জন পাক সেনা ও রাজাকারকে আত্মসমর্পণ করান—এমন দাবি করেছেন। অথচ মুক্তিযুদ্ধের প্রমাণপত্রে কিংবা কিশোরগঞ্জ জেলা ভিত্তিক ইতিহাসে সেই যুদ্ধের কোন বর্ণনা নেই। এমন ভয়াবহ সফলতার কোন স্বীকৃতিও তাঁকে দেয়া হয়নি।
উইকিপিডিয়া ও কিছু অনলাইন উৎসে তাঁকে কিশোরগঞ্জ জেলার মুজিব বাহিনীর প্রধান বলা হলেও তিনি নিজেই দাবি করেছেন সেক্টর-৫ কমান্ডার মীর শওকত আলীর অধীনে যুদ্ধ করেছেন। প্রশ্ন জাগে—তিনি আসলেই কোন ভূমিকায় ছিলেন?
সবশেষে বলা যায়, ফজলুর রহমান নিঃসন্দেহে একজন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু তাঁর মুখ থেকে শোনা গলাবাজি-ভরা বীরত্বগাঁথার সাথে মুক্তিযুদ্ধের দলিল-প্রমাণের কোন মিল নেই। কিশোরগঞ্জ-সিলেট অঞ্চলের যুদ্ধ ইতিহাসে তাঁর নাম কোথাও উজ্জ্বল হয়ে ওঠেনি। আরও অবাক করা বিষয় হলো, এত বড় একজন ‘কমান্ডার’, তথাকথিত মুজিব বাহিনীর প্রধান হয়েও কেন তিনি নিজের যুদ্ধজীবন নিয়ে একটি লাইনও লেখেননি?
এ প্রশ্নের উত্তর এখনও অমীমাংসিত।


