আবুল বারাকাতকে ঘিরে বিতর্ক
সূচিপত্র
ঢাকা: মানবিক বিবেচনার কথা মাথায় রেখে ১২২ জন বিশিষ্ট নাগরিক সম্প্রতি আবুল বারাকাতের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু তাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে। দেশে জঙ্গি-সংগঠন নিয়ে তার গবেষণা, ব্যাংক খাতের ভূমিকা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ সম্পর্কিত বক্তব্য—সবই বিতর্কিত আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে।
বারাকাত তার গবেষণায় দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশে ১৩২টি জঙ্গি সংগঠন সক্রিয়। কিন্তু এর বেশিরভাগেরই আদতে অস্তিত্ব নেই বলে পরে প্রমাণিত হয়। আশ্চর্যের বিষয়, আহলে হাদীস আন্দোলন, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ইসলামী সমাজ এবং নেজামে ইসলাম পার্টির মতো রাজনৈতিক দলগুলোকেও তিনি জঙ্গি তালিকায় যুক্ত করেছিলেন। নামের বানান ভুলে ভরা ছিল গবেষণাটি। উদাহরণস্বরূপ, ‘নেজামে ইসলাম’-এর পরিবর্তে লিখেছিলেন ‘নিজামায়ে ইসলাম’।
পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, সেই তালিকায় থাকা তথাকথিত নাম ব্যবহার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বহু নিরাপরাধ মানুষকে হয়রানি, গ্রেফতার, নির্যাতন ও গুমের শিকার করেছে। অভিযোগ রয়েছে, এতে ঘুষ বাণিজ্যও ফুলেফেঁপে ওঠে এবং অসংখ্য পরিবারের জীবন তছনছ হয়ে যায়। কিন্তু গবেষণার ত্রুটি নিয়েও সে সময়ে উল্লেখযোগ্য প্রশ্ন তোলা হয়নি।
তার ৭২ পৃষ্ঠার গবেষণা ‘বাংলাদেশে মৌলবাদ ও মৌলবাদী জঙ্গিত্বের রাজনৈতিক অর্থনীতি’-তে দাবি করা হয়, মৌলবাদী অর্থনীতির বার্ষিক নীট মুনাফা ১২০০ কোটি টাকা। এর মাত্র দশ শতাংশ সাংগঠনিক কার্যক্রমে বিনিয়োগ করলে লাখ লাখ দরিদ্র সদস্যকে পূর্ণকালীন নিয়োগ দেওয়া সম্ভব। কিন্তু হিসাব মেলাতে গেলে দেখা যায়, একজন দরিদ্র সদস্য মাসে মাত্র ২০০ টাকা পেতেন। অর্থাৎ যুক্তি ও পরিসংখ্যানের মধ্যে অসংগতি স্পষ্ট।
বারাকাত দায়িত্ব পেয়েছিলেন জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে। তার সময়েই ‘একক ব্যক্তির ঋণে বৃহত্তম কেলেঙ্কারি’র ঘটনা ঘটে। এক ব্যক্তির ২২ প্রতিষ্ঠানের নামে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ দেওয়া হয়। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সরাসরি মন্তব্য করেছিলেন—বারাকাতই ব্যাংকটি ধ্বংস করে দিয়েছেন।
আরও বড় বিতর্ক তৈরি হয় ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে। তার গবেষণায় এই ব্যাংকের মাধ্যমে জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগ করা হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং ধীরে ধীরে এর আর্থিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। সমালোচকরা মনে করেন, বারাকাতের গবেষণা সেই প্রক্রিয়ার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
২০১৬ সালে বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বারাকাত বলেন, “জঙ্গিরা অচিরেই দেশের গ্রামগুলো দখল করবে।” প্রমাণ হিসেবে তিনি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি তুলে ধরেন—বাংলাদেশে নাকি মৌলবাদীদের ১৪৮টি অস্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। এই বক্তব্যকে অনেকে বিদেশি হস্তক্ষেপকে ন্যায্য করার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
এসব কারণেই সমালোচকদের মতে, বারাকাতের কর্মকাণ্ড কেবল বিতর্কিতই নয়, রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকরও ছিল। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও গবেষণার নামে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি। নাহলে বহু নিরীহ মানুষের ওপর সংঘটিত অন্যায়ের দায় চিরকাল থেকেই যাবে। যারা আজ তার মুক্তির দাবি তুলেছেন, তারাও এই অন্যায়ের সারথি হয়ে উঠছেন কি না—সে প্রশ্নও এখন জোরালোভাবে উঠে এসেছে।
আবুল বারাকাত বিতর্ক: ভুয়া জঙ্গি তালিকা, ব্যাংক কেলেঙ্কারি ও বিদেশি হস্তক্ষেপ
ঢাকা: আবুল বারাকাতকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ১২২ জন বিশিষ্ট নাগরিক তার মুক্তির দাবি তুললেও, গবেষণা ও ব্যাংক খাতের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হয়েছে। বিশেষ করে তার গবেষণায় বানানো জঙ্গি দলের তালিকা, ইসলামী ব্যাংককে জঙ্গি অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত করার অভিযোগ, জনতা ব্যাংক দুর্নীতি এবং বিদেশি হস্তক্ষেপকে ন্যায্য করার বক্তব্য—সবই এখন আলোচনায়।
ভুয়া জঙ্গি তালিকার অভিযোগ
বারাকাত দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশে ১৩২টি জঙ্গি সংগঠন সক্রিয়। অথচ এর বেশিরভাগেরই কোনো অস্তিত্ব নেই। আশ্চর্যের বিষয়, আহলে হাদীস আন্দোলন, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ইসলামী সমাজ, নেজামে ইসলাম পার্টি-র মতো বৈধ রাজনৈতিক দলকেও তিনি জঙ্গি সংগঠন হিসেবে দেখিয়েছিলেন। এমনকি অনেক নামের বানানও ছিল ভুল।
জনতা ব্যাংক কেলেঙ্কারি
চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বারাকাতের সময়েই ঘটে জনতা ব্যাংকের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঋণ কেলেঙ্কারি। এক ব্যক্তির ২২ প্রতিষ্ঠানের নামে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ দেওয়া হয়। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, “বারাকাতই ব্যাংকটি শেষ করে দিয়েছেন।”
ইসলামী ব্যাংককে জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগ
তার গবেষণায় বলা হয়েছিল, ইসলামী ব্যাংক জঙ্গিদের অর্থায়ন করছে। এর ফলে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক রাজনৈতিক প্রভাবের মুখে পড়ে এবং ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। সমালোচকরা মনে করেন, এটি ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
বিদেশি হস্তক্ষেপ ন্যায্য করার অভিযোগ
২০১৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে বারাকাত দাবি করেন—“জঙ্গিরা অচিরেই দেশের গ্রাম দখল করবে।” তিনি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথাকথিত রিপোর্টকে প্রমাণ হিসেবে দেখান। সমালোচকরা মনে করেন, এটি আসলে বিদেশি হস্তক্ষেপকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা ছিল।
উপসংহার
সমালোচকদের মতে, আবুল বারাকাতের কর্মকাণ্ড শুধু বিতর্কিতই নয়, রাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতিকর। তার বিরুদ্ধে ভুয়া গবেষণা, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকাণ্ড নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি। অন্যথায় বহু নিরীহ মানুষের ওপর সংঘটিত অন্যায়ের দায় চিরস্থায়ী হবে।
প্রশ্নোত্তর (FAQ)
আবুল বারাকাতের গবেষণা কেন বিতর্কিত?
তিনি বাংলাদেশে ১৩২টি জঙ্গি সংগঠন আছে বলে দাবি করেছিলেন, যার অনেকগুলো আদৌ অস্তিত্বহীন ছিল।
জনতা ব্যাংক কেলেঙ্কারির সঙ্গে তার সম্পর্ক কী?
চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময়েই এক ব্যক্তির কাছে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়।
তিনি ইসলামী ব্যাংককে কেন অভিযুক্ত করেছিলেন?
বারাকাত দাবি করেছিলেন, ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে জঙ্গি অর্থায়ন হয়। তবে এ অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ মেলেনি।
বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ কেন উঠেছে?
তিনি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথাকথিত রিপোর্টকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, যা অনেকেই বিদেশি প্রভাব ন্যায্য করার চেষ্টা মনে করেন।


