মাজলুম রোহিঙ্গাদের নিয়ে পরাশক্তিগুলোর নির্মম রাজনীতি
"মাজলুম রোহিঙ্গাদের নিয়ে পরাশক্তিগুলোর নির্মম রাজনীতি"
রোহিঙ্গা সংকট আজ বিশ্ব রাজনীতির এক জঘন্য খেলায় পরিণত হয়েছে। পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের সংঘাতে এই নির্যাতিত জনগোষ্ঠী বারবার ব্যবহৃত হচ্ছে। একদিকে চীন, অন্যদিকে আমেরিকা ও জাতিসংঘ—প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য রোহিঙ্গাদের নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে কূটনৈতিক চাল।
"চীনের স্বার্থ ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন"
চীন বারবার বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিচ্ছে যেন রোহিঙ্গাদের দ্রুত মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়। অন্যদিকে, জাতিসংঘ বলছে—আরাকান এখনো রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য উপযোগী নয়।
কিন্তু চীনের মূল লক্ষ্য মানবিকতা নয়, বরং তাদের বৃহৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। চীনের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো মালাক্কা প্রণালি হয়ে চীনে প্রবেশ করতে হয়, যেখানে আমেরিকার শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এর ফলে চীনকে প্রচুর ট্যাক্স ও জ্বালানি ব্যয় করতে হয়।
এই খরচ কমাতে তারা আরাকান থেকে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে একটি সুয়েজ ক্যানেলের মতো বিকল্প নৌপথ নির্মাণ করতে চায়।
কিন্তু এই প্রকল্পের প্রধান বাধা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। জাতিসংঘের বিধিনিষেধের কারণে আরাকানকে মুক্তভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই চীন চায় যেকোনো উপায়ে রোহিঙ্গাদের আরাকানে ফেরত পাঠাতে। এরপর উইঘুর মুসলিমদের মতো বন্দিশিবিরে আটকে রেখে তাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়।
"আমরা যখন কারাগারে ছিলাম, তখন আরসার সেকেন্ড-ইন-কমান্ড শাহ আলী (জুনুনীর বড় ভাই) বলেছিলেন—
"চীন ইতোমধ্যে মিয়ানমারে ১০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে!"
কারাগার থেকে বের হয়ে আমরা তথ্য সংগ্রহ করে দেখি, চীনের বিনিয়োগ কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।"
এই বিনিয়োগের মূল কেন্দ্র আরাকান ও মিয়ানমার সরকার। তাই চীন রোহিঙ্গাদের কৌশলে সরিয়ে দিয়ে নিজের স্বার্থ নিশ্চিত করতে চায়।
"আমেরিকা ও জাতিসংঘের রাজনৈতিক চাল"
অন্যদিকে, আমেরিকার প্রধান লক্ষ্য চীনের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন ঠেকানো। তাদের হাতিয়ার হলো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী।
আমেরিকা প্রথমে আরসা (আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি)-কে পরোক্ষভাবে সহায়তা দিয়েছিল। শুরুতে আরসার নাম ছিল "আল ইয়াকিন", তাদের পতাকায় ছিল কালিমা খচিত তাওহীদের পতাকা।
কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংগঠনটিকে গ্রহণযোগ্য করতে তাদের নাম ও পতাকা পরিবর্তন করানো হয় এবং এটিকে আঞ্চলিক সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
কিন্তু পরবর্তীতে প্রধানত দুটি ঘটনায় আমেরিকা আরসার ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে—
আরসার অন্যতম নেতা "মাস্টার মুহিব্বুল্লাহর" হত্যা এবং আরসা প্রধান আতাউল্লাহ জুনুনীর শরীয়াহ-কঠোরতার কারণে আমেরিকার অসন্তোষ।
এরপর আমেরিকা আরাকানে "আরএসও" (রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন) এবং "এএ" (আরাকান আর্মি)-কে ব্যবহার করতে শুরু করে। ফলে আরসা একঘরে হয়ে পড়ে।
"আরসার রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও পতন"
২০২৩ সালের শেষদিকে, জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়তে আরাকানভিত্তিক সব সংগঠন এক প্ল্যাটফর্মে আসে। কিন্তু আরসা তখন রাজনৈতিকভাবে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয় এবং অন্যদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করতে পারে না। ফলে তারা তিন দিক থেকে শত্রুতার মুখোমুখি হয়—
"মিয়ানমারের সামরিক জান্তা"
আরাকানের অন্যান্য বিদ্রোহী সংগঠন
বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই ও র্যাব
আরসার আরেকটি মারাত্মক ভুল ছিল বাংলাদেশের র্যাব ও ডিজিএফআই কর্মকর্তাদের জিম্মি করা।এতে তারা বাংলাদেশকেও শত্রুতে পরিণত করে, যা তাদের জন্য কূটনৈতিকভাবে ভয়াবহ ক্ষতি বয়ে আনে। এ কারণে অনেকে তাদের "হাইব্রিড মস্তিষ্কের বিপ্লবী" বলতে শুরু করে।
"আমরা যখন কারাগারে ছিলাম, তখনই উপলব্ধি করেছিলাম—
আরসার নেতারা গ্লোবাল রাজনীতি তো দূরে থাক, আঞ্চলিক রাজনীতিও বোঝে না। তাদের কোনো নিরাপত্তা কৌশল নেই, পরিকল্পনাহীন এবং একেবারেই অপটু।
"আরসার পতন ও বর্তমান পরিস্থিতি"
নানা নাটকীয়তার পর গতকাল আরসার প্রধান আবু আম্মার জুনুনী এবং শরয়ী বিভাগের প্রধান শাইখুল হাদিস মুশতাক আহমদ সাহেব গ্রেফতার হয়েছেন।
ফাক্কাল্লাহু আসরাহুম (আল্লাহ তাদের মুক্ত করুন)।
রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ কী হবে? চীনের প্রকল্প কীভাবে বাস্তবায়িত হবে? আমেরিকা নতুন কী কৌশল নেবে? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী দিনে।
আমাদের অবস্থান ও পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ইনশাআল্লাহ আগামী পর্বে হবে।
