রাজনীতি
⏱ ৬ মিনিট পড়া
ভারত কী বাংলাদেশে আক্রমণ করতে প্রস্তুত?
প্রকাশক — পর্যবেক্ষণ
ভারত কী বাংলাদেশে আক্রমণ করতে প্রস্তুত?
Eastern Command-Indian Army বাংলাদেশের চতুর্দিকে দারুণ তৎপরতার সাথে গত ০৫ মাস যাবত মহড়া পরিচালনা করে আসছে। ওদের ওসব মহড়ার আকার থেকে অনুমান করা যায় যে, সেগুলো ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর আক্রমণাত্মক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুতিমূলক মহড়া।
সর্বশেষ ওরা গত 'February' হতে বিশেষ করে শিলিগুড়িতে যে মহড়াটি পরিচালনা করেছে, সেটি এবং সেটির অনুসরণ করে শুরু হওয়া '17 Mountain Strike Corps' এর পরবর্তী সাম্প্রতিক মহড়া হতে আমরা ওদের বাংলাদেশ পরিকল্পনা বিষয়ক একটি 'Possible Scenario' দাঁড় করাতে পারি।
পাশাপাশি, অমন একটি পরিস্থিতিতে Indian Navy বাংলাদেশকে নিষ্ক্রিয় করতে কি ভূমিকা রাখবে, তারও একটি ধারণা আমরা এখান হতে পেয়েছি। যা নিম্নে চিত্রায়ণ করা হলো।
০১|
আমাদের মধ্যকার একটি ধারণা হলো, ভারতীয় সামরিক বাহিনী বাংলাদেশে সামরিক অভিযান পরিচালনার কালে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরাসরি ঢাকায় চলে আসার চেষ্টা করবে। আর তার চেষ্টা হামলার প্রথম পর্বেই শুরু করবে ওরা।
তবে, আমার ধারণা হলো, এটি বাস্তবতা থেকে একটু দূরে। ভারতীয় সামরিক বাহিনী ওদের বাংলাদেশ পদক্ষেপের শুরুতে মূলত ০২টি 'Key Objective' অর্জনের চেষ্টা চালাবে। যেখানে ওদের প্রধান লক্ষ্য হবে সবার আগে কৌশলগত 'Chicken Neck' এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যেটি ওরা সম্ভবত অর্জন করতে চায় আলোচ্য অঞ্চলের 'Strategic Depth' বৃদ্ধি করার মাধ্যমে। অতঃপর ওদের আরেকটি লক্ষ্য হবে, বাংলাদেশকে সমুদ্রপথ হতে বিচ্ছিন্ন করা।
অনুমান করা যায় যে, সম্প্রতি শিলিগুড়ির 'Chicken Neck' অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা Indian Army এর '33 Corps' উক্ত লক্ষ্যবস্তুকে সামনে রেখে সুদীর্ঘ একটি মহড়া পরিচালনা করেছে। যার মাঝে ওদের সাঁজোয়া বাহিনীর ০১ মাস দীর্ঘ 'Tank Maneuver' ও 'Live Firing' অন্তর্ভুক্ত ছিল। যেখানে ওরা খুব সম্ভবত আমাদের পঞ্চগড় হতে দিনাজপুর পর্যন্ত সুদীর্ঘ অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার একটি অনুশীলন কার্যক্রম চালনা করেছে।
এখানে জেনে রাখা দরকার যে, দিনাজপুর বরাবর ভারতের দু'দিকের সীমান্তের দূরত্ব মাত্র ১৪০ কিলোমিটার। যার প্রতিরক্ষার জন্য Border Guard Bangladesh এর নর্থ-ওয়েস্টার্ন রিজিয়ন ও বাংলাদেশ আর্মির রংপুর এরিয়া কমাণ্ডের '66 Infantry Division' ব্যতীত আর তেমন কোনো শক্তিশালী সামরিক ফর্মেশন বর্তমানে আমার নজরে আসেনি। সুতরাং, আমাদের আলোচ্য 'Worst Case Scenario' তে ইণ্ডিয়ান আর্মির '33 Corps' যদি এদিকে আগমন করে, তাহলে আমাদের ডিফেণ্ডারদের মাত্র ০১টি ডিভিশন ওদের কর্পস শক্তির কয়েকগুণ শক্তিশালী হামলা কতক্ষণ সামাল দিয়ে রাখতে পারবে, তা আসলে বলা মুশকিল।
'33 Corps' এর 'Order of Battle' (ORBAT) এর দিকে যদি আমরা নজর দিই, আমাদের পঞ্চগড় হতে মাত্র ৮৯ কিলোমিটার দূরে ওদের '20th Mountain Division' এর সেনানিবাস অবস্থিত। আলোচ্য ডিভিশনটি ১৯৭১ সালে Pakistan Army এর ওপর হামলা চালিয়ে আমাদের হিলি পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করেছিল। বিপরীতে কর্পসটির অধীনে থাকা বাকি দু'টি ডিভিশন তখন চীনের দিকে মোতায়েন অবস্থায় অবস্থানরত থাকে। যেটি আলোচ্য ভবিষ্যত পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও হয়তো প্রযোজ্য হবে।
আর এখানেই আসতে পারে Indian Army এর '17 Mountain Strike Corps' এর এক অথবা একাধিক 'Integrated Battle Group (IBG)' এর ভূমিকা। IBG হলো ৫,০০০ সেনার সমন্বিত শক্তির একটি ফর্মেশন, যারা অফেন্সিভ অপারেশন পরিচালনার জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত। '17 Corps' কে পূর্বাঞ্চলীয় কমাণ্ড মূলত চীনের বিরুদ্ধে 'Counter Offensive' পরিচালনার জন্য তৈরি করেছিল। যার জন্য কর্পসটির অধীনে এখন পর্যন্ত ০৫টি 'IBG' আকৃতির ফর্মেশন রয়েছে। আলোচ্য কর্পসের সদরদপ্তর পশ্চিমবঙ্গের পানাগড়ে অবস্থিত।
সুতরাং, যখন Indian Special Forces ও Indian Air Force এর শুরু করা সমন্বিত হামলা সমাপ্ত হবে, তখন '17 Mountain Strike Corps' এর আনুমানিক ০১টি 'IBG' ও '33 Corps' এর '20th Mountain Division' দু'দিক দিয়ে অভিযান শুরু করে লালমনিরহাট হতে হিলি পর্যন্ত অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করতে পারে। যার মাধ্যমে ওরা আমাদের '66 Infantry Division' কে Bangladesh Army এর মূল শক্তি হতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে সমর্থ হবে। অতঃপর বিমান হামলার ছত্রছায়ায় স্থানীয় সন্ত্রাসীদের সহায়তায় সেখানে নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় মনোযোগ দিবে ওরা।
এর মাধ্যমে ওদের একটি 'Objective' সম্পন্ন হলো। 'Battlefield Shaping Operation' এর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ওদের দ্বিতীয় আরেকটি 'Objective' বাকি থাকছে।
০২|
বাংলাদেশকে সমুদ্রপথ দিয়ে পৃথিবী হতে বিচ্ছিন্ন করা। আলোচ্য তৎপরতাটি পরিচালনা করা ভারতের জন্য একটু মুশকিল হবে। কারণ, এখানে লক্ষ্যবস্তু অর্জনের জন্য ভারতকে আমাদের কমপক্ষে ০২টি ডিভিশন ও Bangladesh Navy কে সামাল দিতে হবে। শেষোক্ত কাজটি ওদের জন্য হয়তো সহজ হতে পারে, কিন্তু, কুমিল্লা সেনানিবাসের '33 Infantry Division' ও চট্টগ্রাম সেনানিবাসের '24 Infantry Division' কে আচমকা সামাল দিয়ে দেওয়া ওদের জন্য মোটেও সহজ হওয়ার কথা নয়। তবে, ওদের এখানে মূল 'Objective' হবে চট্টগ্রামের সাথে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সরাসরি 'Land Access' বন্ধ করে দেওয়া। চট্টগ্রাম দখলে নেওয়া না।
সেক্ষেত্রে ওরা হয়তো বিশেষ করে কুমিল্লা সেনানিবাসের দিকে ওদের মূল লক্ষ্য স্থাপন করবে। এর মধ্য দিয়ে ফেনী থেকে স্বন্দ্বীপ বরাবর নিজেদের একটি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাবে ওরা। চট্টগ্রামকে ওরা বাংলাদেশ হতে আলাদা করার চেষ্টা করার কারণ হলো, চট্টগ্রাম ওদের অপারেশনের জন্য একটি ঝুকিপূর্ণ স্থান। চট্টগ্রামের 'Terrain' জটিল। যেখানে বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠন ও গোষ্ঠী আগে থেকে অবস্থান করছে। যাদের কিছু আবার ভারত নিজেরা খাড়া করেছে। আবার, চট্টগ্রামে রয়েছে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গার অবস্থান। যাদের ইতিমধ্যে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে রয়েছে। তারপর আবার তাঁদের হৃদয়ে যদি নতুন করে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর দ্বারা দেওয়ালে পিষ্ট হওয়ার ভয় ঢুকে যায়, তাহলে বিষয়টি সামাল দেওয়া চট্টগ্রামে উপস্থিত হওয়া ভারতের প্রাথমিক পর্যায়ের অভিযানের সেনাদের সাধ্যের বাহিরে চলে যেতে পারে। যা ওদের জন্য বুমেরাং হয়ে দেখা দিবে। এগুলো ছাড়াও, চট্টগ্রামের '24 Infantry Division' আমাদের দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ফর্মেশন। সুতরাং, চট্টগ্রামকে ওরা দিনাজপুর, রংপুরের মতো সরাসরি হাতের মুঠোয় নেওয়ার চেষ্টা না করে, বিচ্ছিন্ন করে রাখার চেষ্টা করবে।
সর্বশেষে, আমাদের অবশিষ্ট থাকা মংলা বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য গভীর সমুদ্রে ভারতীয় নৌ-বহর অবস্থান নিবে। আলোচ্য পরিস্থিতিতে পাকিস্তান প্রথমে এখানে হয়তো সরাসরি কিছু করতে পারবে না, কারণ, আপনারা তো নিজেরাই বেলুচিস্তানের অবস্থা দেখছেন। অন্যদিকে চীনও সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে নিজের সুবিধাজনক সময় ও স্বার্থ হাসিলের সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে।
উপরোক্ত কর্মকাণ্ড সফলতার সাথে সমাপ্ত হলে ভারত বাংলাদেশের গভীরে ভবিষ্যতে একটি 'Decisive Operation' চালনার মতো অবস্থা অর্জন করবে। যা ওরা নিজেদের সুবিধাজনক সময়ে হয়তো আরম্ভ করবে। তার পূর্বে উপরোক্ত কর্মকাণ্ড ওরা কোন অজুহাতে চালাবে, তা অনুমানের চেষ্টা করা আসলে অপ্রয়োজনীয়। কারণটি Director of National Intelligence, Tulsi Gabbard এর সাম্প্রতিক বক্তব্য হতে ধারণা করে নেওয়া যেতে পারে। বাস্তবতা হলো, ওরা হামলার সিদ্ধান্ত নিলে অজুহাত তৈরি করা মোটেও কঠিন নয়।
(উপরোক্ত চিত্রটি আসলে বাস্তবতায় রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু তা আমি বলতে পারি না। অথবা কবে বাস্তবতায় পরিণত হতে পারে, সেটিও আমাদের অজানা। তবে, আলোচ্য চিত্রটি একটি বাস্তব সম্ভাবনা)
ধন্যবাদ।