ইসলাম ও মুসলিম ১৪ আগস্ট ২০২৫ ⏱ ৫ মিনিট পড়া

রোহিঙ্গারা আসলেই কী অপরাধ প্রবণ জনগোষ্ঠী

প্রকাশক — পর্যবেক্ষণ

সংশোধিত সংস্করণ:

আমাদের ভূখণ্ড আজ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম শরণার্থী ধারণকারী অঞ্চলের স্বীকৃতি লাভ করেছে। সেই অসহায় শরণার্থীদের একটি বড় অংশ ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখে।

সেবার বাংলার মাটিতে আশ্রয়ের খোঁজে আগত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ লাখ। বাংলাদেশে আসার পর বাংলার মানুষ তাঁদের আপনজনের মতো গ্রহণ করে—নিজ পরিবারে টেনে নেয়। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে তা ছিল আমাদের ভূখণ্ডে তাঁদের ভবিষ্যৎ তৎপরতার জন্য একটি সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি।

আলোচনার পূর্বে কিছু বিষয় পরিষ্কার করা দরকার:

০১ | রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আগমনের পর বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে অপরাধ বৃদ্ধির অভিযোগ এবং অপরাধে রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততা।
০২ | তুলনামূলক কম শিক্ষা এবং নগরজীবনের অভাবজনিত আচরণ, যা স্থানীয়দের চোখে অস্বস্তিকর হিসেবে প্রতিভাত হয়।

আলোচনার শুরুতেই বলতে চাই, রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত করার আগে আমাদের অনুধাবন করা প্রয়োজন, অপরাধের জন্য দায়ী আসলে তাদের জাতিসত্তা, না কি তাঁদের ওপর আপতিত বর্তমান মানবেতর বাস্তবতা।

এই অনুসন্ধানের জন্য আমরা অন্যান্য শরণার্থী জাতি ও আশ্রয়দাতাদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করেছি। এদের মধ্যে তুরস্ক ছিল অন্যতম।

তুরস্কে শরণার্থীদের আগমন ও অপরাধ সংক্রান্ত বাস্তবতা:

মধ্যপ্রাচ্য থেকে তুরস্কে শরণার্থীদের আগমন শুরু হয় ১৯৮৮ সালে, যখন ইরাকি বাহিনী কুর্দিদের ওপর “Anfal Campaign” নামক নারকীয় অভিযান চালায়। এ অভিযানে প্রচণ্ড মাত্রার Counter-Insurgency (COIN) কার্যক্রম দেখা যায়, যা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকেও দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করে।

এই শরণার্থীরা মানবেতর শিবিরজীবনে নেমে যাওয়ার পর স্মাগলিং, মাদক ও মানব পাচারের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এদের ব্যবহার করত তুরস্কের সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র, বিশেষ করে মাফিয়ারা।

তালেবান সরকার গঠনের আগে আফগানিস্তানে হেরোইনের ব্যাপক চাষ হতো, যা ইরান হয়ে উত্তর ইরাক পাড়ি দিয়ে তুরস্কে প্রবেশ করত। এসব মাদক আনা হতো পাহাড়ি পথ দিয়ে কুর্দি শরণার্থীদের “কুলি” হিসেবে ব্যবহার করে। এখান থেকেই মাদক ছড়িয়ে পড়ত ইউরোপে। আর যেখানে মাদক, সেখানেই হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণসহ ভয়াবহ অপরাধ গজিয়ে ওঠে।

২০১১ সালে সিরিয়ান শরণার্থীদের ক্ষেত্রেও দৃশ্যপট ছিল প্রায় একইরকম। তখন তুর্কি ও কুর্দি মাফিয়ারা সিরিয়ান শরণার্থীদের পাচার, নারীদের যৌনদাসী করে বিক্রি, জাল কাগজ তৈরির মতো অপরাধে ব্যবহার করতে শুরু করে। ইস্তাম্বুল, আঁদানা, মারসিন, গাঁজিয়ান্তেপ—সর্বত্র সিরিয়ানদের অপরাধে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।

মূল বক্তব্য হলো: শরণার্থীদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া কোনো জাতিগত সমস্যা নয়, বরং এটি শোষণের ফলাফল।


রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আচরণ এবং শিক্ষা সংক্রান্ত প্রসঙ্গ:

শিক্ষা ও নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত একটি জনগোষ্ঠীর আচরণে কিছু সেকেলে বৈশিষ্ট্য থাকতেই পারে। এটি তাদের দোষ নয়। রোহিঙ্গারা এমন এক রাষ্ট্রে বাস করতেন যেখানে নাগরিক স্বীকৃতি পর্যন্ত ছিল না। ফলে শিক্ষা তো দূরের কথা, জীবনের ন্যূনতম অধিকার থেকেও তাঁরা বঞ্চিত ছিলেন।

তাঁদের শিক্ষিত ও সভ্য করে তোলার দায়িত্ব আজ আমাদের। কেউ যদি নিজেদের ‘নাক উঁচু’ মনে করে তা থেকে অব্যাহতি চায়, তা অন্য প্রসঙ্গ। তবে ইতিহাস বলে—প্রত্যেক শরণার্থী গ্রহণকারী দেশে এমন কিছু ‘নাক উঁচু অসভ্য’ সবসময় থাকে।


মূল আলোচনায় প্রবেশ:

রোহিঙ্গা তথা আরাকানের মুসলিমদের সাথে বাংলাদেশের মুসলিম জনপদের সহানুভূতি ভারতের National Security Apparatus-এর চোখে ছিল এক সম্ভাব্য বিপদের পূর্বাভাস। কারণ, এই সম্পর্ক মজবুত হলে রোহিঙ্গাদের আরাকানে শক্তিশালী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বেড়ে যেত। ফলে, ভারত চায়নি চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল কখনো বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের প্রভাবে একত্রিত হোক।

ভারতের উদ্দেশ্য বরং উল্টো—চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল রাখা। সে লক্ষ্যেই ওরা হয়তো Special Frontier Force (SFF) মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছিল।

২০২৪ সালের নভেম্বরে সাইফুল ইসলাম আলিফের (تَقَبَّلَ اللهُ) হত্যাকাণ্ডে আমরা ভারতের প্রভাবিত Front Organization-দের কার্যক্রমের ভয়াবহতা দেখেছি। এমনকি হিন্দি ভাষার প্রভাব, মুসলিম পরিচয়ে আতঙ্কিত চলাচল ইত্যাদিও লক্ষ্য করা গেছে।

সুতরাং, এমন অঞ্চলে হঠাৎ লক্ষ লক্ষ মুসলমানের আগমন ভারতের জন্য বড় হুমকি। কারণ, একবার রোহিঙ্গা ও স্থানীয়রা সহানুভূতির বন্ধনে আবদ্ধ হলে সেই সম্পর্কের ওপর আঘাত করে সহিংসতা উস্কে দেওয়া সহজ নয়।


ভারতের মিডিয়া অপারেশন ও গণমত নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা:

রোহিঙ্গাদের জন্মহার, অপরাধ প্রবণতা ইত্যাদি নিয়ে কৌশলী বিদ্বেষমূলক প্রচার শুরু করে ভারতীয় নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া, যেটি মূলত ইসরায়েলি কৌশল থেকে শেখা। এর উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশি তরুণদের সহানুভূতি রোধ করে রোহিঙ্গাদের প্রতি ঘৃণা তৈরি করা।

কারণ, রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিরা একত্র হলে আরাকানে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, যা ভারতের নিয়ন্ত্রণকেও চ্যালেঞ্জ করে।


আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মূল্য:

আজ আরাকানে যদি রোহিঙ্গারা বিজয়ী হয়, একমাত্র বাংলাদেশই লাভবান হবে। চীন, ভারত, মিয়ানমার কেউ না। কিন্তু আজ বাংলাদেশের কোনো hard power নেই, যার মাধ্যমে আমরা এই পরিস্থিতিকে কৌশলে ব্যবহার করে নিজেদের আন্তর্জাতিক অবস্থান মজবুত করতে পারি।

১৯৭৭-৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় যে কৌশল গ্রহণ করা হয়েছিল—রোহিঙ্গাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে বার্মায় ফেরত পাঠানোর হুমকি—তা আজ বাস্তব প্রয়োগের উপযুক্ত সময়। কারণ, কেবল হুমকি আজ যথেষ্ট নয়।


প্রস্তাবিত কৌশল:

বাংলাদেশের উচিত:

  1. রোহিঙ্গাদের মধ্যে শিক্ষা, নেতৃত্ব এবং সংগঠন গড়ে তোলা।

  2. পরোক্ষভাবে সামরিক প্রশিক্ষণ ও সজ্জিত করার উদ্যোগ গ্রহণ।

  3. তুরস্কসহ অন্য দেশগুলোর সহায়তা নেওয়া।

  4. আরাকান পরিস্থিতিতে নিজেদের Stakeholder হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা।


উপসংহার:

রোহিঙ্গা ইস্যুকে শুধুই শরণার্থী সমস্যা না ভেবে এটিকে একটি আন্তর্জাতিক কৌশলগত অবস্থান পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখা দরকার।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যেভাবে সাহসিকতার সাথে শরণার্থী সমস্যার সমাধান এনেছিলেন, আজ আমাদের নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বেরও তেমন কিছু করতে হবে—আরও আধুনিক, আরও দৃঢ় কৌশল নিয়ে।



শেয়ার করুন
Facebook X WhatsApp Telegram LinkedIn
QR কোড স্ক্যান করে পড়ুন
বিভাগ: ইসলাম ও মুসলিম © ২০২৬ পর্যবেক্ষণ

মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

একই বিভাগের অন্যান্য লেখা

লিবারেল মুখোশের আড়ালে জামায়াত: কেন ভয়টা থেকেই যায়
ইসলাম ও মুসলিম

লিবারেল মুখোশের আড়ালে জামায়াত: কেন ভয়টা থেকেই যায়

??ামায়াতকে আমি ভয় পাই—এই কথাটা কখনও ভয়ে বলি না। ভয়টা হলো, জামায়াত যত ক্ষমতাবান হবে, তত বেশি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়বে। এবং এই…

পর্যবেক্ষণ ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
যে সাফাই জামায়াতকে বাঁচায়, কিন্তু ইসলাহকে মেরে ফেলে
ইসলাম ও মুসলিম

যে সাফাই জামায়াতকে বাঁচায়, কিন্তু ইসলাহকে মেরে ফেলে

??ই মুহূর্তে জামায়াতের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল ভেতর থেকে গড়ে ওঠা কিংবা বাইরে থেকে যাওয়া একদল প্রজ্ঞাবান, ন্যায়নিষ্ঠ ও আদর্শে অবিচল উলামা…

পর্যবেক্ষণ ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
কৌশলের নামে গণতন্ত্রের ফাঁদে ইসলামপন্থীরা
ইসলাম ও মুসলিম

কৌশলের নামে গণতন্ত্রের ফাঁদে ইসলামপন্থীরা

??ুয়াড়িদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে: “The house always wins।” শেষ পর্যন্ত ক্যাসিনোই (জুয়াঘর) জিতবে। কিন্তু এই প্রচলন এবং আরও অনেক…

পর্যবেক্ষণ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
↑