আলেমদের কি ভুল হয় না?
সূচিপত্র
আলেমদের কি ভুল হয় না?
জেনারেল দাঈ ভাইয়েরা যেহেতু আলেম নন, সেহেতু তাদেরকে অনুসরণ করতে হবে রয়েসয়ে—এই মর্মে একটি পোস্ট করার পর অনেক ভাই ফুঁসে উঠেছেন; তারা পাল্টা মন্তব্য ছুড়ে দিলেন, আলেমদেরও ভুল হয়; তাই তাদেরকেও রয়েসয়ে অনুসরণ করতে হবে!
কথাটা সত্য, তবে মতলব খারাপ। মূলত নিজ পছন্দমতো নির্দিষ্ট এক সার্কেলের আলেমদেরকে মান্য করে বাকিদেরকে মাইনাসের লিস্টে ফেলে দেওয়ার জন্য এরকম কথা উঠানো হয়। দেখা গেছে, যেসব ভাই আলেমদেরও ভুল হয়—এই কথা জোরেশোরে বলেন, তারা কিন্তু তাদের পছন্দনীয় আলেমদের ভুল মানতে নারাজ!
জি ভাই, আলেমদের অবশ্যই ভুল হয়। আলেমরাও ভুলের ঊর্ধ্বে নন। আল্লাহর রাসুল ﷺ ব্যতীত উম্মাহর কেউই মূলত ভুলের ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু আলেমের ভুল ধরবে কে? আপনি-আমি? আলেমের ভুল ধরিয়ে দেবেন আরেকজন বড় মাপের আলেম। যদি ভুল প্রমাণিত হয়, তাহলে ভুলের শিকার ওই আলেম রুজু করবেন।
এ ব্যাপারে ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতি রহ. বলেছেন, কোনো আলেমের ভুল হয়ে গেলে এবং এরপর সেটা প্রতীয়মান হবার পর আলেমের উচিত সেই ভুল থেকে রুজু করা। আলেমের পক্ষে ভুলের ওপর জিদ ধরে থাকা ঠিক নয়। (১)
তবে যেকোনো আলেমকে যেকোনো বিষয়ে যেকারও পক্ষে ভুলের তকমা লাগিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। যেহেতু সালাফ থেকে নিয়ে খালাফ পর্যন্ত উম্মাহর আলেমদের মাজহাব, মাসলাক, মানহাজ ভিন্ন ভিন্ন, তাই এ দিকটাও মাথায় রাখতে হবে। আপনার মাজহাব, মাসলাক, চিন্তাধারা ও মতাদর্শের বিপরীত হয়ে গেলেই ওই আলেম ভুলের শিকার—সেটা কিন্তু বলা যাবে না।
এ ব্যাপারে ইমাম ইবনু জারির তাবারি বলেন, যেকোনো আলেমের ব্যাপারে যদি ভ্রান্ত মাজহাব/চিন্তাধারার দাবি উঠানো হয় এবং সেটাকে বাস্তব মনে করে ওই আলেমের গ্রহণযোগ্যতা দূরীভূত হয়ে যায়, তাহলে তামাম দুনিয়ার সব অঞ্চলের আলেমদেরকে বর্জন করতে হয়। কারণ, প্রায় সব আলেমের ব্যাপারেই তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার মতো কিছু না কিছু নেগেটিভ কথা ছড়ানো হয়! (২)
নন-আলেমের ভুল আর আলেমের ভুল এক না। আলেমের ভুল শুধরিয়ে দেবেন আরেকজন কোয়ালিফাইড আলেম। উম্মাহর আলেমদের এটাই চিরাচরিত ইতিহাস। যেমন ইমাম শাফিয়ি রহ. জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম সুফিয়ান সাওরির ভুল ধরেছেন। এমনকি তিনি তাঁর উস্তাদ ইমাম মালিক রহ.-কেও ছাড় দেননি!
সাহাবায়ে কেরাম এই উম্মাহর সবচেয়ে বড় আলেম হওয়া সত্ত্বেও কারও থেকে কোনো ভুল হলে একে অপরকে শুধরিয়ে দিতেন। উদাহরণস্বরূপ, হজরত মুয়াবিয়া রা. ও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. একসঙ্গে হজ করছিলেন। তো মুয়াবিয়া রা. কাবাঘরের সবগুলো কর্ণার স্পর্শ করতে লাগলেন। ব্যাপারটা লক্ষ করে ইবনে আব্বাস বললেন, দুই ইয়ামানি রুকন (কর্ণার) ছাড়া আর কোনো কর্ণার স্পর্শ করতে রাসুল ﷺ নিষেধ করেছেন। মুয়াবিয়া রা. বললেন, কাবাঘরের কোনো অংশই বাদ রাখা যায় না! ইবনে আব্বাস বললেন, রাসুল ﷺ-এর সুন্নাহর অনুসরণ করতে হবে। মুয়াবিয়া রুজু করে বললেন, আপনি ঠিক বলেছেন। (৩)
ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর অন্যতম শিষ্য ছিলেন ইমাম যুফার ইবনুল হুজাইল রহ.। তিনি বড় মাপের ফকিহ হবার পাশাপাশি বড় মুহাদ্দিসও ছিলেন। আবু হানিফা ও তাঁর ছাত্রদের মত হলো, যথাসম্ভব হদ রহিত করার চেষ্টা করতে হবে। তো একবার ইমাম যুফারের সাক্ষাত ঘটল আবদুল ওয়াহিদ বিন যিয়াদ নামক সে কালের আরেক আলেমের সাথে। তিনি ইমাম যুফারকে বললেন, আপনারা হদ যথাসম্ভব রহিতকরণের পক্ষে, অথচ আপনারাই কোনো মুসলিম যদি কোনো কাফেরকে হত্যা করে, তাহলে কাফেরের বিনিময়ে মুসলিমকে হদ প্রয়োগ করে হত্যা করার ফতোয়া দেন! সাথে সাথে ইমাম যুফার বললেন, আপনি সাক্ষী থাকুন, আমি আমার এই মত থেকে রুজু করলাম। (৪)
এখানে সবচেয়ে চমৎকার উদাহরণ হিসেবে পেশ করা যায় শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া ও তাঁর ছাত্র ইমাম শামসুদ্দিন যাহাবি রহ.-কে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. থেকে যখন একের পর এক আকিদা ও ফিকহে জুমহুর উলামায়ে কেরামের বিপরীত বিচ্ছিন্ন মতামত প্রকাশ হতে থাকে এবং এতে করে গোটা শাম ও মিসরে ফিতনা দেখা দেয়; এতে করে সে যুগের হানাফি, মালিকি, শাফিয়ি; এমনকি হাম্বলি আলেমরা পর্যন্ত ক্ষেপে যান এবং এসবের কারণেই ইবনে তাইমিয়াকে বারবার কারাবন্দি হতে হয়, তখন ইবনে তাইমিয়ার ভুল ধরে তাঁরই ছাত্র ইমাম যাহাবি তাঁকে চিঠির মাধ্যমে নাসিহা করেছিলেন। সেই চিঠি আজও "আন-নাসিহাতুয যাহাবিয়্যাহ" বা স্বর্ণালি উপদেশ হিসেবে খ্যাত। যদিও সালাফিরা এটার সত্যতা মানতে চান না, কিন্তু এটা প্রমাণিত সত্য। প্রসিদ্ধ মুহাক্কিক আলেম বাশশার আওয়াদ মারুফ এটার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
যেসব ভাই আপত্তি করেন যে, আলেমদেরও ভুল হয়, তারা মূলত নিজেদের মতাদর্শের বাইরের আলেমদেরকে অবজ্ঞা করার জন্যই এ কথাটা বলে থাকেন। এদের মধ্যে অনেকেই তো সুযোগ পেলেই রীতিমতো আলেমদের শানে বেয়াদবিও করে বসেন! অথচ, নিজ চিন্তা ও মতাদর্শের সাথে সামঞ্জস্য না হলেও আলেমদের সম্মান করতে হয়। এ সম্মান আল্লাহ, রাসুল ও ইসলামই দিয়েছে আলেমদেরকে।
নবিজি ﷺ স্পষ্ট ভাষায় আলেমদের শানে বেয়াদবি না করতে বলে গেছেন। উবাদাহ ইবনে সামিত রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার উম্মাহর বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না এবং আলেমদের শান বোঝে না, সে আমার দলভুক্ত নয়! (৫)
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেছেন, আল্লাহ, আল্লাহর রাসুলের সাথে বন্ধুত্বতার পর মুমিনদের সাথে বন্ধুত্বতা করা; বিশেষ করে উম্মাহর আলেমদের সাথে বন্ধুত্বতা করা সকল মুসলমানের ওপর অবশ্য কর্তব্য। (৬)
আলেমদের সম্মান করা ইসলামের অন্যতম আকিদাও বটে! ইমাম আবু জাফর তাহাবি রহ. বলেন, কল্যাণব্রতী, মুহাদ্দিস, ফকিহ ও উসুলবিদ আলেমদেরকে ভালো বৈ মন্দ বলা যাবে না। যে ব্যক্তি তাদের ব্যাপারে খারাপ কথা বলবে, সে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর পথ ও মতের ওপর নয়। (৭)
আলেমদের ব্যাপারে নেগেটিভ কিছু না বলার ব্যাপারে প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ইমাম ইবনে আসাকিরের ঐতিহাসিক উক্তিটা উল্লেখ করতেই হয়। তিনি বলেন, আলেমদের গোশত বিষাক্ত। আলেমদের সম্মানহানি যারা করে, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার চিরাচরিত রীতিও সবার জানা। যে ব্যক্তি আলেমদের মানহানি করার জন্য মুখ খোলে, মৃত্যুর আগে আল্লাহ তাআলা সে ব্যক্তিকে অন্তরপ্রদাহের রোগে আক্রান্ত করেন। (৮)
ইবনে আসাকিরের কথাটা যে বাস্তব, তা প্রতীয়মান হয় শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে হাজার আসকালানির বর্ণনায়। তিনি বলেন, হিজরি সপ্তম শতকে ইয়ামানের শাফিয়ি মাজহাবের একজন নামকরা ফকিহ, আলেম ও কাজি ছিলেন ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ যাবিদি রহ.। ইনি এত বড় ফকিহ ছিলেন যে, ফিকহ শাস্ত্রে ৪০ খণ্ডের একটি কিতাব লেখেছেন। তাঁর দারসে গোটা ইয়ামান থেকে ছাত্ররা এসে হাজির হতেন। পুরো ইয়ামানে এক ডাকে তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। কিন্তু এত বড় আলেম হওয়া সত্ত্বেও তিনি ইমাম নববির কট্টর সমালোচক ছিলেন। ফলে মৃত্যুর সময় তাঁর জিহ্বা সামনে বেরিয়ে পড়ে এবং তা কুচকুচে কালো হয়ে যায়! লোকেরা মনে করতে থাকে যে, এটা ইমাম নববির পিছে পড়ে থাকার ফল! (৯)
ইমাম আহমাদ ইবনুল আযরায়ি বলেন, আলেমদের ব্যাপারে; বিশেষ করে বড় আলেমদের সমালোচনায় লিপ্ত হওয়া কাবিরা গোনাহ! (১০)
ইমাম আবদুল্লাহ ইবনুল মোবারক রহ. বলেন, যে ব্যক্তি আলেমদের নিয়ে উপহাস করে, তার আখিরাত বরবাদ হয়ে যায়! (১১)
প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ইমাম ইবনুল আব্বাস হাসান বিন সুফিয়ান রহ.-এর একজন কট্টর সমালোচক ছিল। ওই লোক থেকে তিনি এতটাই কষ্ট পেয়েছিলেন যে, একসময় তা সহ্যের বাইরে চলে যায়। শেষমেশ তিনি বলেই ফেললেন, হে লোক! নব্বই বছর বয়সেও আমি তোমাকে সহ্য করেছি। কিন্তু আলেমদের ব্যাপারে কটূক্তি করতে তুমি আল্লাহকে ভয় করো; কেননা বলা যায় না কার না কার বদদুয়া তোমার ওপর লেগে যায়! (১২)
নোট : এ ব্যাপারে লিখতে গেলে অনেক লেখা যাবে। কিন্তু আলেমদের মর্যাদা বোঝার জন্য এবং তাদের সমালোচনার ব্যাপারে সতর্ক থাকার জন্য এটুকুই যথেষ্ট বলে মনে করি।
প্রিয় ভাই, আপনাকে মনে রাখতে হবে যে, ইসলাম একটি বৈচিত্র্যময় দ্বীন। সাহাবায়ে কেরাম রা. থেকে নিয়ে এখন পর্যন্ত ইসলামের আকিদা, ফিকহ, চিন্তা, মতাদর্শ, মাজহাব, মাসলাক, মানহাজের ভিন্নতা রয়েছে এবং কিয়ামত অবধি সেটা থাকবে।
আপনি দলিলের আলোকে যেসব আলেমকে হকের অধিক নিকটবর্তী মনে করবেন, তাদের অনুসরণ করবেন। তবে বাদবাকিদের সমালোচনা, উপহাস, অবজ্ঞা, বেয়াদবি করা যাবে না। তাদের ভুল ধরার দুঃসাহস করবেন না। দলিলের আলোকে আপনি যেটা সঠিক মনে করছেন, হয়তো বাকিরা সেটাকে ভিন্ন কোনো দলিলের আলোকে ভুল মনে করছেন।
দ্বীন অনুসরণের ক্ষেত্রে কোনো না কোনো বিজ্ঞ আলেমের ছত্রছায়ায় থাকুন। যথাসম্ভব ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তার অধিকারী কাউকে মুরুব্বি বানান। দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়িকারী আলেমও আছেন এই সমাজে। ভারসাম্যপূর্ণ কারও কাছে না গেলে দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির কিছুই আঁচ করতে পারবেন না। আপনার চিন্তাতেও ভারসাম্যতা চলে এলে আলেমদের ভুল ধরার প্রবণতা চলে যাবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের বোঝ দান করুন।
তথ্যসূত্রাবলি :
(১) আল-মুযহির ফি উলুমিল লুগাহ, পৃষ্ঠা : ২/৩২০, ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতি।
(২) হাদইয়ুস সারি, পৃষ্ঠা : ৪২৮, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি।
(৩) সুনানে তিরমিযি, হাদিস : ৮৫৮।
(৪) ফাতহুল বারি : ১২/২৬২, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি।
(৫) সুনানে তিরমিযি, হাদিস : ১৯২০, হাদিসটি হাসান।
(৬) রাফউল মালাম আন আয়িম্মাতিল আলাম, পৃষ্ঠা : ১১, ইমাম ইবনে তাইমিয়া।
(৭) আকিদাতুত তাহাবি, পৃষ্ঠা : ২২, ইমাম আবু জাফর তাহাবি।
(৮) তাবয়িনু কাযিবিল মুফতারি, পৃষ্ঠা : ২৮, ইমাম ইবনে আসাকির।
(৯) আদ-দুরারুল কামিনাহ : ৪/১০৬, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি।
(১০) আর-রাদ্দুল ওয়াফির, পৃষ্ঠা : ১৯৭।
(১১) সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/৪০৮, ইমাম শামসুদ্দিন যাহাবি।
(১২) সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১৪/১৫৯, ইমাম শামসুদ্দিন যাহাবি।
লেখক আইনুল হক কাসেমী
