ইসলাম ও মুসলিম ১৩ আগস্ট ২০২৫ ⏱ ৪ মিনিট পড়া

পাথর উত্তোলন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হলে ভারত কেন পাথর উত্তোলন করে?

প্রকাশক — পর্যবেক্ষণ
পাথর উত্তোলন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হলে ভারত কেন পাথর উত্তোলন করে?



ভোলাগঞ্জের পাথরের সৌন্দর্য আজ সোশ্যাল মিডিয়ার ফিল্টারকৃত ছবিতে আবেগের জলতরঙ্গ সৃষ্টি করেছে। শুধু অর্থনীতির অঙ্ক নয়, এই ঝলমলে সাদা পাথরের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভূরাজনৈতিক খেলা, রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসঘাতকতা এবং একটি জাতির আত্মহত্যাপূর্ণ নীতির নগ্ন দলিল। এখানে আবেগপ্রবণতার আড়ালে লুকিয়ে আছে ভা*র*তের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, পরিবেশবাদী নামধারী এনজিওর এজেন্ডা, এবং আমাদের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের কুৎসিত রূপ।



ভোলাগঞ্জ, জাফলং ও কোম্পানিগঞ্জ—এই অঞ্চলগুলো কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের নির্মাণশিল্পের প্রাণকেন্দ্র ছিল। মেঘালয়ের পাহাড় থেকে বর্ষার স্রোতে ভেসে আসা প্রাকৃতিক পাথর সারি, ডাউকি, পিয়ান নদী হয়ে এই এলাকায় জমা হতো। ২০১৬ সালের আগে বাংলাদেশ থেকে এই পাথর তামাবিল স্থলবন্দর দিয়ে মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা, ভা*র*তের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রপ্তানি হতো।ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি ও অসংখ্য ব্রিকফিল্ড এই পাথরের উপর নির্ভরশীল ছিল।
ভা*র*তের জন্য এটি ছিল ভৌগোলিক দুর্ভাগ্য— নিজেদের ভূখণ্ডে পাথর জমাতে না পেরে ভা*র*তকে বাংলাদেশ থেকেই কিনতে হতো।
২০১২ সালে মার্কিন রকফেলার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে র‍্যাম ম্যাগনেসে পদক পাওয়া পরিবেশ বিষয়ক উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের সংগঠন বেলা (Bangladesh Environmental Lawyers Association) ২০১৪ সালে উচ্চ আদালতে রিট করে সিলেট অঞ্চলে পাথর উত্তোলন বন্ধের জন্য। তাদের প্রধান যুক্তি ছিল— পরিবেশ ধ্বংস, নদীর নাব্যতা হ্রাস, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি। আওমীলীগ সরকার দ্রুত এই রিট বাস্তবায়ন করে এবং ২০১৬ সালের পর থেকে অধিকাংশ কোয়ারি বন্ধ হয়ে যায়।
ফলাফল :
- লক্ষাধিক শ্রমিক বেকার।
- কোম্পানিগঞ্জ, জাফলং, ভোলাগঞ্জ— পুরুষশূন্য জনপদ, বাজার নিঃস্ব।
- ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি কার্যত অচল।
- নির্মাণশিল্পে পাথরের ঘাটতি, আমদানি নির্ভরতা বৃদ্ধি।
কোয়ারিগুলো বন্ধ হওয়ার ফলে ভা*র*ত অবিলম্বে নিজেদের ভূখণ্ডে শত শত পাথর কোয়ারি স্থাপন করে। ২০১৪-২০২৩ সালের মধ্যে ভা*র*ত বছরে গড়ে ৫০০-৭০০ মিলিয়ন ডলারের ক্রাশড স্টোন বাংলাদেশে রপ্তানি করে।
শুল্ক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালের হিসাবে ভা*র*ত থেকে আমাদের—
- ক্রাশড স্টোন আমদানির আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি টাকা।
- চুনাপাথর (লাইমস্টোন) আমদানির আর্থিক পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকা
- অঘোষিত ও অনানুষ্ঠানিক আমদানির আর্থিক পরিমাণ আনুমানিক ৩০০-৪০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত।
এখানে লক্ষ্য করুন— আমরা যে পাথর বিনা খরচে পেতাম, সেটিই ভা*র*ত প্রক্রিয়াজাত করে ডলারের বিনিময়ে আমাদের কাছে বিক্রি করছে।
পরিবেশ রক্ষার নামে পাথর উত্তোলন বন্ধ করা হলেও বাস্তবে তার বিপরীত ফলাফল এসেছে :
- নদীতে পাথর জমে নাব্যতা ধ্বংস হয়েছে।
- বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢলের পানি আটকে গিয়ে নদীর পানি দ্রুত উপচে পড়ছে।
- চেরাপুঞ্জি-মেঘালয়ের পানি ডাউকি ও সারি নদী দিয়ে দ্রুত নেমে এসে ভোলাগঞ্জ-সিলেট অঞ্চল প্লাবিত করে।
- নদীতে জমে থাকা পাথরের কারণে পানি নিষ্কাশনের গতি কমে গিয়ে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয়।
অর্থাৎ, পাথর উত্তোলন বন্ধ করাই পরিবেশের ক্ষতির মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে কোয়ারি বন্ধের মাধ্যমে ভা*র*ত একই সঙ্গে দুই সুবিধা পেয়েছে—
১। নিজ ভূখণ্ডে পাথর জমা করা
২। বাংলাদেশের বাজার দখল করা।
বেলার মতো সংগঠনগুলো পশ্চিমা দাতা সংস্থার অর্থে পরিচালিত হয়, যাদের নীতি প্রায়ই ভা*র*তীয় কূটনৈতিক স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই প্রণীত হয়।
আওমীলীগ সরকারের আমলে রেকর্ডসংখ্যক অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল পাথর ব্যবহৃত হলেও দেশীয় উৎসকে ধ্বংস করে বিদেশি আমদানির উপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে আওমী লীগের পতনের পর উচ্চ আদালত পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ায় বছর খানেকের মধ্যেই এনজিওকর্মী পরিবেশবাদী উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান পুনরায় গিয়ে পাথর উত্তোলন বন্ধের দাবি তোলে এবং কার্যক্রম স্থগিত হয়।



যদি এই ধারা চলতে থাকে—
- আমাদেরকে বছরে ১,০০০ কোটি টাকারও বেশি পাথর আমদানি করতে হবে।
- সিলেট অঞ্চলের শ্রমবাজার আরও ধ্বংস হবে।
- নদীর নাব্যতা কমে বন্যার ঝুঁকি বাড়বে।
- ছাতক সিমেন্ট ও সংশ্লিষ্ট শিল্প চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
ভোলাগঞ্জের সাদা পাথরের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে আমার যদি এই ভূরাজনৈতিক প্রতারণা না ধরতে পারি, তবে আমাদের জন্য আফসোস।



আমরা যদি এই দেশকে সত্যিই স্বনির্ভর দেখতে চাই, তবে প্রথম কাজ হবে এই পরিবেশবাদী মুখোশধারীদের "রাষ্ট্রদ্রোহী" হিসেবে চিহ্নিত করা, তাদের বিদেশি অর্থায়ন বন্ধ করা, এবং ভা*র*তীয় অর্থনৈতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় কৌশল গ্রহণ করা।
ভোলাগঞ্জের পাথর শুধু অর্থনীতি নয়, এটি আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। যে রাষ্ট্র নিজের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে পারে না, সে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা শুধু কাগজে লেখা থাকে।

লেখক আবু উসামা
শেয়ার করুন
Facebook X WhatsApp Telegram LinkedIn
QR কোড স্ক্যান করে পড়ুন
বিভাগ: ইসলাম ও মুসলিম © ২০২৬ পর্যবেক্ষণ

মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

একই বিভাগের অন্যান্য লেখা

লিবারেল মুখোশের আড়ালে জামায়াত: কেন ভয়টা থেকেই যায়
ইসলাম ও মুসলিম

লিবারেল মুখোশের আড়ালে জামায়াত: কেন ভয়টা থেকেই যায়

??ামায়াতকে আমি ভয় পাই—এই কথাটা কখনও ভয়ে বলি না। ভয়টা হলো, জামায়াত যত ক্ষমতাবান হবে, তত বেশি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়বে। এবং এই…

পর্যবেক্ষণ ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
যে সাফাই জামায়াতকে বাঁচায়, কিন্তু ইসলাহকে মেরে ফেলে
ইসলাম ও মুসলিম

যে সাফাই জামায়াতকে বাঁচায়, কিন্তু ইসলাহকে মেরে ফেলে

??ই মুহূর্তে জামায়াতের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল ভেতর থেকে গড়ে ওঠা কিংবা বাইরে থেকে যাওয়া একদল প্রজ্ঞাবান, ন্যায়নিষ্ঠ ও আদর্শে অবিচল উলামা…

পর্যবেক্ষণ ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
কৌশলের নামে গণতন্ত্রের ফাঁদে ইসলামপন্থীরা
ইসলাম ও মুসলিম

কৌশলের নামে গণতন্ত্রের ফাঁদে ইসলামপন্থীরা

??ুয়াড়িদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে: “The house always wins।” শেষ পর্যন্ত ক্যাসিনোই (জুয়াঘর) জিতবে। কিন্তু এই প্রচলন এবং আরও অনেক…

পর্যবেক্ষণ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
↑