শেখ মুজিব হত্যায় আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা কী জড়িত ?
সূচিপত্র
শেখ মুজিব হত্যায় আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা কী জড়িত?
যে অল্প কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুজিব হত্যার ঘটনায় রিপোর্ট করেছিলেন, লরেন্স লিফশুলজ তাদের অন্যতম। মুজিব হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী সংঘাতময় নভেম্বর মাসের ঘটনাবলি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন প্রখ্যাত এই মার্কিন অনুসন্ধানী সাংবাদিক।
১৯৭৪ ও ’৭৫ সালজুড়ে লিফশুলজের কর্মক্ষেত্র ছিল দক্ষিণ এশিয়া। Far Eastern Economic Review–এর সাবেক দক্ষিণ এশীয় প্রতিনিধি ও The Guardian–এর নিয়মিত লেখক লিফশুলজ বারবার ১৫ই আগস্টের অভ্যুত্থান ও হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত নানা অজানা অধ্যায়ের নতুন দরজা উন্মোচন করেছেন।
বেশ কিছু গ্রন্থের প্রণেতা লিফশুলজ Anatomy of a Coup নামের সিরিজ রচনায় মুজিব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছেন। এছাড়া Bangladesh: The Unfinished Revolution–এ মুজিব হত্যায় বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ’র জড়িত থাকার বিষয়টি তুলে এনেছেন তিনি।
ক্রিস্টোফার এরিক হিচেন্স নামে আরেক মার্কিন সাংবাদিক তার The Trial of Henry Kissinger গ্রন্থে লিফশুলজের বরাত দিয়ে মুজিব হত্যাকাণ্ডে সিআইএ’র জড়িত থাকার বিষয়টি জোরালোভাবে সমর্থন করেন। এ গ্রন্থে তিনি নানা নথিপত্র দিয়ে প্রমাণ করেন যে, সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশ সফরের সময় ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে বসেই ১৫ আগস্টের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ‘সবুজ সংকেত’ দেন।
ক্রিস্টোফার এরিক হিচেন্স কিসিঞ্জারকে একজন অসাধারণ স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন, এক বিচিত্র মিথ্যাবাদী ও যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
২০০১ সালের মার্চে Harper’s নামক এক ম্যাগাজিনে লেখা এক নিবন্ধে লিফশুলজ বলেন,
“বিভিন্ন ঘটনা থেকে আমরা দেখতে পাই যে, কিসিঞ্জার রাজনীতির বিষয়টাকে একটি নিতান্ত ‘ব্যক্তিগত’ ব্যাপার হিসেবে গ্রহণের প্রবণতা দেখিয়েছেন। তার কারণে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ দিয়েছে। তার জন্য করুণ পরিণতি বরণ করেছেন এমন কিছু ব্যক্তির কথাও আমরা জানি। যাদের মধ্যে রয়েছেন সালভাদর আলেন্দে, আর্চ বিশপ ম্যাকারিওস ও শেখ মুজিবুর রহমান।”
মুজিব হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ অনুসন্ধানের পর প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে সামরিক আদালতে কর্নেল তাহেরের বিচারের অনুসন্ধানও করেছিলেন এই সাংবাদিক। যার ভিত্তিতে লিখেছিলেন Bangladesh: The Unfinished Revolution। তখন বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল তাকে।
লিফশুলজ বলেন,
“আমরা এও জানি, সিআইএ’র স্টেশন চিফের (ফিলিপ চেরি) সঙ্গে প্রাইভেট মিটিংও হয়েছিল ঢাকায়। মার্কিন দূতাবাসে এ নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল যে কী হতে চলেছে। রাষ্ট্রদূত ডেভিস বস্টার খুবই বিষণ্ন ও বিরক্ত ছিলেন। কারণ, অন্য দূতাবাস কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না।”
ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের সিআইএ স্টেশনের চিফ ফিলিপ চেরি স্বীকার করেছেন, "চক্রান্তকারীদের" সঙ্গে বরাবরই তার যোগাযোগ ছিল। মুজিব হত্যার সংবাদ তিনিই ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন। ভয়েস অব আমেরিকা’র সেই সংবাদ বুলেটিন আজও প্রমাণ করে, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আমেরিকার চক্রান্ত কতটা গভীরভাবে জড়িত ছিল।
এখানে একটি প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে— মুজিব হত্যার সেই রাতে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের ভেতরে কী ঘটছিল? আশ্চর্যজনকভাবে, আগেভাগেই ১৫ আগস্টকে দূতাবাসের ছুটির দিন ঘোষণা করা হলেও সারারাত সেখানে চলেছে অস্বাভাবিক কর্মব্যস্ততা। দূতাবাসের উচ্চপদস্থ অফিসারদের অধিকাংশই সেদিন ঘুমের শয্যায় যাননি; বরং তারা কাটিয়েছেন সেই রাতটিই অফিসে।
ভারতীয় সাংবাদিক পরেশ সাহা তার মুজিব হত্যার তদন্ত বইয়ে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন—
“শেখ মুজিবকে যেদিন হত্যা করা হয়, সেদিন রাতে মার্কিন দূতাবাস ছিল অতিমাত্রায় কর্মচঞ্চল। উচ্চপদস্থ অনেক অফিসারই সেদিন সারারাত জেগে ছিলেন।”
এর সঙ্গে মিলে যায় আরেকটি দৃশ্য— অভ্যুত্থানের সময় শেখ সেলিম ও শেখ মারুফ নিকটবর্তী মার্কিন দূতাবাসের প্রধান সচিবের বাসায় আশ্রয় চাইতে ছুটে যান। কিন্তু দেখা গেল, সচিব নিজে তখন বাড়িতে নেই; তিনি সারা রাত ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন দূতাবাসেই। তার স্ত্রী টেলিফোনে সব খবর পৌঁছে দেন স্বামীকে। পরে ওয়াশিংটন থেকে অনুমতি এনে সাময়িকভাবে তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হলেও শেখ ভ্রাতৃদ্বয় সেখানে একদিনের বেশি থাকেননি।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়।
১৫ আগস্ট ভোরে একটি গাড়ি ঢুকে পড়ল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। গাড়িটি পূর্ব থেকে পশ্চিমে, আবার ভেতরে নানা রাস্তায় ঘুরে চলে গেল বাইরে। ঠিক সেই সময়েই ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে চলছে হত্যাযজ্ঞ। গাড়িটির বিবরণ ও প্লেট নম্বর দেখেই অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম নিশ্চিত হন— এটি মার্কিন দূতাবাসের গাড়ি।
আরও স্পষ্ট হয়, যখন কর্নেল ফারুক নিজেই স্বীকারোক্তি দেন— তার লোকেরা যখন হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছিল, তখন ঢাকার রাজপথে মার্কিন দূতাবাসের বহুসংখ্যক গাড়ির আনাগোনায় সে নিজেও বিস্মিত হয়েছিল।
এইসব দৃশ্য আমাদের সামনে এক সত্য উন্মোচন করে দেয়— ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড কেবল একটি সামরিক অভ্যুত্থান ছিল না; বরং তা ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাবার চাল।
ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেজাউল করিম এক কলামে এ হত্যাকাণ্ড বিষয়ে দেশীয় ষড়যন্ত্রের সঙ্গে বিদেশী বা আন্তর্জাতিক চক্রান্তের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তার সেই লেখা থেকে অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো—
‘১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড শুধু দেশীয় ষড়যন্ত্রের ফসল ছিল না; এর সাথে জড়িত ছিল একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ভালোভাবে মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন— বিশেষ করে হেনরি কিসিঞ্জারের একটি বড় পরাজয়, ভুট্টো ও পাকিস্তানের সামরিক এস্টাব্লিশমেন্টের জন্য চপেটাঘাত। তারা এ পরাজয়ের প্রতিশোধের অপেক্ষায় ছিলেন। তখন চলছিল স্নায়ুযুদ্ধ। বিশ্ব ছিল দুই ভাগে বিভক্ত— একভাগে ছিল আমেরিকার নেতৃত্বে পুঁজিবাদী ব্লক, আরেকভাগে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক ব্লক। বাংলাদেশ ছিল জোটনিরপেক্ষ গ্রুপে, তবে সোভিয়েত ঘেঁষা। কেননা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা ছিল অনন্য। ভারতও ছিল সোভিয়েত ঘেঁষা। দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বামদের একচ্ছত্র প্রভাব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাম্য ছিল না।’
জানিয়ে রাখি, ১৯৭১–এ সেইন্ট মার্টিন বাগিয়ে নেবার শর্তে শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বানানোর লোভ দেখিয়েও ব্যর্থ হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
অর্থাৎ, মুজিব হত্যাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী বয়ান সৃষ্টিতে প্রথম থেকেই আমেরিকার হাত ছিল। ‘স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি বনাম বিপক্ষ শক্তি’ বয়ানের ভিত্তিতে এই কওমকে বিভক্ত করতে মুজিব হত্যার মতো সংবেদনশীল ইস্যু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বহিঃশত্রুর divide and rule নীতির মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে।
’৭৫–এ বাকশালী মুজিবের হত্যাকাণ্ডের পরও ’৯৬–তে এবং ১/১১ এর পর দোর্দণ্ড প্রতাপে ক্ষমতায় আসে প্রতিশোধপরায়ণ আওয়ামী লীগ। প্রতিবারই তাকে সমর্থন দিয়েছে আমেরিকা। আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট হিসেবে গড়ে তুলতে হিন্দুত্ববাদী ভারতকে প্রথম থেকেই সহকারী রূপে ব্যবহার করেছে ওয়াশিংটন।
গত পনেরো বছর আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বৈধতা তৈরি করা যেসব মিডিয়া জুলাই অভ্যুত্থানের পর গত এক বছর ধরে আওয়ামী বিরোধিতার মুখোশ ধারণ করেছিল, তারাই আজ ভোল পাল্টে শেখ মুজিবের মৃত্যুদিবসে শোকগাথায় ভরিয়ে তুলছে কলামের পর কলাম। তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে বিনোদন জগতের সেলিব্রিটিরাও।
রাষ্ট্রযন্ত্রের পরতে পরতে আজও আওয়ামী আমলের উচ্ছিষ্টভোগী লোকজন। আবু সাঈদ-মুগ্ধদের আত্মাহুতিও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের শিকড় সমূলে উচ্ছেদের জন্য যথেষ্ট হয়নি, যদিও জুলাই আন্দোলনকে ঠিকই ‘বিপ্লব’ হিসেবে পরিচিত করিয়ে প্রতারণা করা হয়েছে জনগণের সাথে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সুদী মহাজন ড. ইউনূসের কত টালবাহানা। অন্যদিকে, তাগুত হাসিনার সর্বোচ্চ শাস্তি প্রয়োগে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের সুশীলতা— হাসিনার নির্দেশে হেলিকপ্টার থেকে করা গুলিতে জান্নাতের পাখি হয়ে যাওয়া নিষ্পাপ শিশুদের তাজা রক্তের সাথে বেইমানি ছাড়া কিছুই নয়। আলোচনার টেবিলে ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’-এর আলাপ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগও ওয়াশিংটনই করে দিয়েছে। সবকিছুই করা হয়েছে এই রাষ্ট্রযন্ত্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের কব্জায় নিতে জনগণের কাছে নীতিগত বৈধতা সৃষ্টির লক্ষ্যে।
আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সামরিক অভ্যুত্থান, জালিমের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের সূচনা ওয়াশিংটনই করে। ফ্যাসিস্টের কালো মুখোশও ওয়াশিংটনই খুলে দেয়, আবার আজ্ঞাবাহী নতুন ফ্যাসিস্টও ওয়াশিংটনই চাপিয়ে দেয়। মিডিয়া হাউজগুলোও ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে। অর্থাৎ, আমাদের দাসত্ববৃত্তি কিংবা বিপ্লবী চেতনা— সবই কনসেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে ওয়াশিংটন।
তাই, মূল শত্রুকে চিনতে না পারলে ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ই ভুলপাঠে পরিণত হবে। শত্রুতা বদলায় না, মুখোশ বদলায়। পর্দার আড়ালে ওয়াশিংটনই ‘শেকলে বাঁধা স্বাধীনতা’র চিত্রনাট্য রচনা করে।
লেখক : আবু উসামা