ইসলাম ও মুসলিম ২৫ আগস্ট ২০২৫ ⏱ ৫ মিনিট পড়া

ক্রুসেড থেকে নব্য উপনিবেশবাদ: মুসলিমদের বিরুদ্ধে বহুমাত্রিক যুদ্ধ

প্রকাশক — পর্যবেক্ষণ
ক্রুসেড থেকে নব্য উপনিবেশবাদ: মুসলিমদের বিরুদ্ধে বহুমাত্রিক যুদ্ধ


ফ্রেঞ্চ রাজা চতুর্থ লুইস সপ্তম ক্রুসেডে মামলুকদের হাতে মিশরে বন্দী হয়েছিল। তখন জেলে বসে সে ভাবছিল, কেন তারা বারবার পরাজিত হয়। সে দেখলো, ক্রুসেডারদের আখলাক ভালো নয়, মুসলিমদের ভালো। ক্রুসেডারদের চরিত্র ভালো নয়, মুসলিমদের ভালো। চরিত্র যত ভালো হবে, মৃত্যুকে সে তত বেশি সহজে গ্রহণ করতে পারবে। চরিত্র খারাপ হলে মৃত্যুকে বেশি ভয় লাগে। তো সে চিন্তা করলো, মুসলিমদের চরিত্র খারাপ করতে হবে। চরিত্র খারাপ হলে তারা আর যুদ্ধে আসতে চাইবে না। পরিবারব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, তারপর সমাজব্যবস্থা। এরকম আরো কিছু সে চিন্তা করে।

তাকে হত্যা না করে মামলুকরা মুক্তি দেয়। মুক্তি পেয়ে সে কিছু মূলনীতি তৈরি করে যায়। এর ভিত্তিতেই পরবর্তী ৫০০ বছর ওরিয়েন্টালিস্টরা শুধু ইসলাম এবং মুসলিমদের ব্যাপারে পড়াশোনা করেছে। তারা ইসলামের ভুল বের করার চেষ্টা করেছে, ভুল ব্যাখ্যা প্রচার করেছে, সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। তাদের এসব মেহনতের ওপর ভিত্তি করেই আজকের মুসলিমদের মধ্যে অনেক ভ্রান্ত ফিরকাহ তৈরি হয়েছে।

তারপর উপনিবেশের সময়, তারা যখন আবার স্বশরীরে মুসলিম ভূমিগুলোতে দখলদারিত্ব শুরু করতে পারলো, তখন তারা মুসলিমদের শিক্ষা ব্যবস্থাই বদলে দিলো এবং ধীরে ধীরে মুসলিমদের আক্বীদার নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করলো।

বর্তমান নব্য-উপনিবেশবাদে হয়তো তারা সব জায়গায় স্বশরীরে দখলদারিত্ব করছে না, কিন্তু তাদের আইডিওলজিকাল ডিএনএ এখানকার মানুষজন ঠিকই বহন করছে, তাদের রেখে যাওয়া শিক্ষা ব্যবস্থা ও সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে, যা তারা দীর্ঘদিন গোলামীর শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার মাধ্যমে জন্ম দিয়ে গেছে। বিদ্যমান এই ব্যবস্থাটা মানুষকে দুর্নীতিবাজ, নির্লজ্জ, চাটুকার, ভোগবাদী, লোকদেখানো—এসব কাজই বেশি প্রমোট করে। তাই এত সংখ্যক মুসলিম থাকা সত্ত্বেও মুকাওয়ামার জন্য সৈনিকের সংখ্যা খুবই কম। ঠিক যেটা লুইস ৮০০ বছর আগে চিন্তা করেছিল।

মুকাওয়ামার জন্য এখন আমরা লোকই পাই না, অথচ আমরা সংখ্যায় কত বেশি। এই যে শিক্ষা ব্যবস্থা, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেমন হবে, সেকুলারিজম, লিবারেলিজম, ফেমিনিজম, ন্যাশনালিজম, ডেমোক্রেসি—এগুলো নব্য উপনিবেশবাদের একেকটা টুল। এদিকে আবার অর্থনৈতিক ডাইমেনশন আছে, সামরিক-রাজনৈতিক ডাইমেনশনও আছে। অর্থাৎ তারা আমাদেরকে একটা মাল্টি-ডাইমেনশনাল যুদ্ধে জড়িয়েছে।

লুইসকে যখন বন্দী করা হয়েছিল, তখন যুদ্ধে এতগুলো মাত্রা ছিল না। তারা কেবল সৈনিক আর সমরাস্ত্র নিয়ে লড়াই করতে আসতো। কখনো জিততো, বেশিরভাগ সময় পরাজিত হতো, কারণ মুসলিমরা আবার regroup হয়ে যেত। কিন্তু পরবর্তীতে তারা যুদ্ধের মাত্রা বাড়ালো। শুধু সম্মুখসমর নয়, তারা দেখলো মুসলিমদের মূল অস্ত্রাগার আসলে সমরাস্ত্র নয়—তাদের ঈমান-আক্বীদা, তাদের আমল, তাদের পরিবার, তাদের সমাজ। এই ক্যান্টনমেন্টে যদি আগুন না লাগানো যায়, যদি অরাজকতা তৈরি না করা যায়, তাহলে শুধু সম্মুখসমর দিয়ে তারা টিকতে পারবে না।

তাই উপনিবেশের সময় তারা যুদ্ধের মাত্রা শুধু সম্মুখসমরে সীমাবদ্ধ রাখেনি; মুসলিম জনগণকে ম্যানুপুলেশনের দিকেও নজর দিয়েছিল। আর নব্য-উপনিবেশবাদ, যেটা এখন চলছে, তারা প্রতিনিয়ত সম্ভাব্য সব উপায়ে আমাদের জনগণকে তাদের স্বার্থের দিকে ম্যানুপুলেট করার চেষ্টা করছে।

তাই আমরা এখন এক ধরনের মাল্টি-ডাইমেনশনাল ওয়ারফেয়ারে আছি। এখানে "ময়দানে গেলাম আর শাহীদ হয়ে গেলাম"—বিষয়টা এতটা সাদা-কালো নয়। ময়দানের কনসেপ্ট এখন অনেক বিস্তৃত হয়ে গেছে। উপনিবেশবাদের শেষ থেকে নব্য উপনিবেশবাদের পর গেরিলা যুদ্ধপদ্ধতি অনেক সফলতা এনে দিয়েছে। কারণ এটা হচ্ছে সবলের সাথে দুর্বলের লড়াই। দুর্বলের জন্য সবলের সামনে সম্মুখসমরে টিকে থাকা খুবই কঠিন। অনেক প্রতিরোধকামী নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সবলের সামনে গিয়ে সম্মুখসমরে। যদিও মুসলিমদের ব্যাপারে আমরা বিশ্বাস করি, তারা মৃত নয়—বরং জীবিত। তারপরও বলছি, এই দুনিয়া হলো আসবাবের দুনিয়া। এখানে বিজয়ের জন্য আসবাবের সঠিক ব্যবহারও একটা শর্ত। উটের রশিটা আপনাকে বাঁধতে হবে। যতটুকু সামর্থ্য আছে, তা দিয়ে। নিয়মিত সামর্থ্য বাড়ানোর চেষ্টা করাটাও জরুরি।

জিহাদবিরোধীরা তো গেরিলা যুদ্ধ বোঝেই না। এমনকি জিহাদপন্থী অনেক মানুষও গেরিলা যুদ্ধ বোঝে না। তার ওপর একিউ ফোর্থ জেন মাল্টি-ডাইমেনশনাল গ্লোবাল জিহাদ—দূর কি বাত! অনেকের দেখি সীরাত পড়া নেই। খলিফাদের জীবনী পড়া নেই, সাহাবাদের জীবনী জানা নেই। ফিতনার সময় কারা ফিতনা ছড়াতো, কিভাবে ছড়াতো, কার কথা কিভাবে গ্রহণ করা উচিত—এগুলো না পড়লে কখনোই বুঝবে না। সমসাময়িক ইতিহাস জানা জরুরি। কে কোন কথা কেন বলে, এটা ধরতে না পারলে আপনি নিজেও প্রতারিত হতে পারেন, এমনকি ফিতনার কারণও হতে পারেন।

আর উম্মাহর সবার জন্য দরদ থাকা প্রয়োজন। নিজেদের প্রচেষ্টা নিয়ে অহংকার করা যাবে না। তাই চেষ্টা করুন—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টপিক কী আমাদের জন্য, সেটাতে ফোকাস করতে। সেই অনুযায়ী ক্যাম্পেইন করুন, থ্রেড তৈরি করুন। অহেতুক বিষয় বানালে মানুষ সেটাতে এঙ্গেজ হবে। এর বদলে মুকাওয়ামার পক্ষে যায় এমন টপিকে জনগণকে ইনভলভ করতে পারলে সেটা অনেক বেশি উপকারী হবে। তখন কাজ সামান্য হলেও এগিয়ে দিচ্ছেন। এজন্য সওয়াবেরও আশা করতে পারেন, তাই না?

Bearded Bangali

শেয়ার করুন
Facebook X WhatsApp Telegram LinkedIn
QR কোড স্ক্যান করে পড়ুন
বিভাগ: ইসলাম ও মুসলিম © ২০২৬ পর্যবেক্ষণ

মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

একই বিভাগের অন্যান্য লেখা

লিবারেল মুখোশের আড়ালে জামায়াত: কেন ভয়টা থেকেই যায়
ইসলাম ও মুসলিম

লিবারেল মুখোশের আড়ালে জামায়াত: কেন ভয়টা থেকেই যায়

??ামায়াতকে আমি ভয় পাই—এই কথাটা কখনও ভয়ে বলি না। ভয়টা হলো, জামায়াত যত ক্ষমতাবান হবে, তত বেশি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়বে। এবং এই…

পর্যবেক্ষণ ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
যে সাফাই জামায়াতকে বাঁচায়, কিন্তু ইসলাহকে মেরে ফেলে
ইসলাম ও মুসলিম

যে সাফাই জামায়াতকে বাঁচায়, কিন্তু ইসলাহকে মেরে ফেলে

??ই মুহূর্তে জামায়াতের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল ভেতর থেকে গড়ে ওঠা কিংবা বাইরে থেকে যাওয়া একদল প্রজ্ঞাবান, ন্যায়নিষ্ঠ ও আদর্শে অবিচল উলামা…

পর্যবেক্ষণ ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
কৌশলের নামে গণতন্ত্রের ফাঁদে ইসলামপন্থীরা
ইসলাম ও মুসলিম

কৌশলের নামে গণতন্ত্রের ফাঁদে ইসলামপন্থীরা

??ুয়াড়িদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে: “The house always wins।” শেষ পর্যন্ত ক্যাসিনোই (জুয়াঘর) জিতবে। কিন্তু এই প্রচলন এবং আরও অনেক…

পর্যবেক্ষণ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
↑