স্টেজে নারী না থাকলেই অধিকার খর্ব হয়?
ইনসাফ ফাউন্ডেশন শতাধিক নারী-পুরুষের উপস্থিতিতে চমৎকার একটি আয়োজন করল।
আয়োজনটি ছিল নারীর অধিকার প্রশ্নে, কিন্তু লিবারেল-আতেঁলরা ধরে নিয়েছে প্রশ্নটি সাম্যের। তাই কুটক্যাঁচাল আরম্ভ করছে—স্টেজে নারী নেই কেন।
স্টেজে নারীর উপস্থিতি থাকতে হবে—এটি মূলত formal equality-এর দাবি। ইনসাফ ফাউন্ডেশন formal equality-এর কথা বলেনি, বরং আলাপ করছে অধিকার (justice-based) প্রসঙ্গে। দৃশ্যত সমতার জন্য স্টেজে নারীর বসা হয়তো জরুরি, কিন্তু অধিকার নিশ্চিত করার সঙ্গে এর ন্যূনতম সম্পর্কও নেই।
একজন নারীর শিক্ষা গ্রহণের অধিকার আছে, কিন্তু প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে সমান সংখ্যক ছেলে-মেয়েকে পাশাপাশি (free-mixing) বসাতে হবে—এটি অধিকার বা ন্যায্যতা কোনোটিই নয়, বরং formal equality-এর দাবি।
আয়োজনটি যেহেতু হুজুররা করেছে, তাই এর ভ্যালিডিটি নষ্ট করতে হবে। ফলত স্টেজে নারীর উপস্থিতির প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে, আয়োজনকে invalidate করার জন্য।
সমতার পশ্চিমা প্যারাডাইমে সবকিছু সমান-সমান লাগবে, অথচ এই প্যারাডাইমের সাথেই আমাদের দ্বন্দ্ব। নামাজের মতো প্রধান ইবাদতেই নারী-পুরুষ পাশাপাশি বসতে পারে না, শরিয়ত অনুমোদন দেয়নি। সেখানে এসব আয়োজন তো নগণ্য।
নারীর সাম্যের প্রশ্নে লিবারেল আঁতেলদের খুশি করতে চান? তাহলে নামাজে পুরুষের ইমামতি নারীর হাতে দিন, নামাজে নারী-পুরুষকে সমান কাতারে দাঁড় করান। এর আগে আঁতেলদের মুখ বন্ধ করতে পারবেন না।
রাবির শিক্ষক আ. আ. মামুন মঞ্চের হুজুরদের ছবির সঙ্গে কিছু শেয়ালের ছবি যুক্ত করেছেন। শেয়াল যেমন মুরগির অধিকার নিয়ে কথা বলে, মঞ্চের পুরুষরাও নাকি তেমনি। আ. মামুন সাহেবরা নারী-পুরুষকে এভাবেই শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্কের দিকে ঠেলে দেন। তার মানে, পুরুষরা নারীর স্বার্থ নিয়ে আলাপ করতে পারবে না।
মূলত, অন্যান্য আদর্শের মতো নারীবাদও শ্রেণীদ্বন্দ্বের আদলে চর্চিত হচ্ছে। নারীবাদ প্রতিনিয়ত সংকট-সীমাবদ্ধতার যে সিলসিলা নির্মাণ করছে তা ‘নারী অধিকার’ নয়, বরং ‘শ্রেণী-রাজনীতি’। হেউড (Heywood) বলেছেন— “Feminist thought can be broadly defined as the ideology of trying to advance the social role of women.”
সাম্প্রতিক সময়ে জাপানে ফেমিনিস্টরা রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিচ্ছে। পুরুষ প্রার্থীর বিপরীতে নারীরা নারী-প্রার্থীদের ভোট দিচ্ছে। ফলে আইনসভায় নারীদের উপস্থিতি বাড়ছে নাটকীয় হারে। ওয়েলশ (Welsh) এসেম্বলিতে ৫০% নারী আইনসভায় জায়গা করে নিয়েছে। অন্যান্য এসেম্বলিতেও সংখ্যা বাড়ছে। ফলে নারীবাদকে ‘নারী অধিকারের’ এজেন্ট ভাবলে ভুল করবেন। নারী অধিকার আর নারীবাদ এক জিনিস নয়। ফেমিনিজমের রয়েছে নিজস্ব আদর্শিক-রাজনৈতিক পরিচয়।
মনে রাখবেন, আমরা নারীর অধিকার বলতে বুঝি—নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা, উত্তরাধিকার, শিক্ষা, ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থান নিশ্চিত করা। সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানে নারী-পুরুষকে প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়ার ব্যাপারে ইসলামের শক্ত দ্বিমত আছে। এটিই ফিতরাত, যার উপর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আমরা নারীর প্রাপ্য মর্যাদা, সুযোগ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চাই—যা স্বয়ং আল্লাহ ঠিক করে দিয়েছেন।
নারী কেন নারীবাদকে অপছন্দ করে? যদি ফেমিনিজম নারী অধিকারের প্রতিনিধিত্ব করত, তাহলে নারী তো স্বাধিকারবিরোধী হতে পারত না। অ্যান্টি-ফেমিনিজম কোনো নতুন বিষয় নয়। গত শতকের সত্তরের দশকে মারাবেল মরগান (Marabel Morgan)-এর The Total Woman বইটি বেস্টসেলার হয়েছিল।
কয়েক বছর আগেও পশ্চিমে ‘নারীবাদ বিরোধী প্ল্যাকার্ড’ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় উত্তাপ ছড়িয়েছিল নারীরা। তাদের প্ল্যাকার্ডে বিচিত্র বাক্য প্রদর্শিত হয়েছিল—
-
“I don’t need feminism because I believe in equality not entitlement and supremacy.”
-
“I don’t need feminism because it reinforces the men as agent and women as victims dichotomy.”
বিশেষত, তারা নারীদের ঐতিহ্যিক প্রথার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তারা মনে করতেন—মা হিসেবে ঘরে থাকার অধিকার ক্ষুণ্ণ করছে ফেমিনিজম। তারা চেয়েছিলেন যথার্থ মা হতে; একটি সুস্থ পরিবার ও সমাজ গড়ে তুলতে।
৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে বিবিসি নিউজ Why so many young women don’t call themselves feminist শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ড. ক্রিস্টিনা শার্ফ (Christina Scharff)-এর তৈরি। তিনি আশ্চর্য হয়ে বলেন— “So it’s perhaps unexpected that the identity ‘feminist’ has not gained more popularity among young women in the western world.” পশ্চিমা সমাজে ফেমিনিজম এখনও যুবতী নারীদের আকর্ষণ করেনি। মুসলিম সমাজে এটি ঢের বেশি জটিল। এসব কারণেই নারীবাদ এবং নারী অধিকারকে আলাদা করেই দেখতে হবে।
খালিম মোহাম্মাদ সাইফুল্লাহ
