ইসলাম ও মুসলিম
⏱ ৫ মিনিট পড়া
ইসলামী তুরাসে যার তার ব্যাখ্যা কী আদৌ গ্রহণযোগ্য?
প্রকাশক — পর্যবেক্ষণ
ইসলামী তুরাসে বিশ্বস্ত থাকা মানে আপনি রেকলেস ব্যাখ্যা করতে পারবেন না। উটকো কোন দাবি সবার উপরে চাপিয়ে দেবার গোয়ার্তুমি করতে পারবেন না। এই তুরাস বা ট্র্যাডিশান গড়ে উঠেছে হাজার বছরের আমল ও ফিকিরে। তাই ইসলামী তুরাস বা ঐতিহ্য অনেকেরই গাত্রদাহের কারণ। পণ্ডিতি ব্যাখ্যা হাজির কইরা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হ'য়ে নিজের এজেন্ডা বাস্তবায়নে বুদ্ধিবৃত্তিক বাধা এই তুরাস। এই তুরাসে দু'একটা শায বা বিচ্ছিন্ন মতকেও পাত্তা দেওয়া হয় অনেকসময়, তবে ইখতেলাফি মত হিসেবে। কিন্তু, যে মত একদম বাতিল, বিকৃত এবং যে মত এমন মস্তিষ্ক থেকে আগত যাদের মতাদর্শ ও বিশ্ববীক্ষাই আলাদা এবং তুরাসকে যারা আমলে আনারই প্রয়োজন মনে করেন না বরং নিজের "হাওয়া" বা প্রবৃত্তি বা জ্ঞানগত প্রকল্প দ্বারা "মত" বাছাই ক'রে সেটাকে "ইসলামী" বলে চালাইতে চান তাদের বিরুদ্ধে আলেমরা সদাই সরব ছিল, দ্বীনি জ্ঞানের সুরক্ষার যে দায়িত্ব তাঁদের উপর অর্পিত আছে সেটির তাগিদেই।
তুরীয় ভাষায় তারা এপিস্টেমিক ভায়োলেন্স চালায়। ইসলামী ইতিহাস এবং ইসলামের "শরা" হয়ে উঠে তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের পরিসর। তাদের সমস্ত "মুক্তচিন্তা"র লাঠি ইসলামের দিকেই ধাবিত প্রধানত! ইসলাম তাদের কাছে জাস্ট একটা "বিষয়"! অব্জেক্টিভিটির নামে তাদের নিজস্ব জ্ঞানগত প্রকল্পের সাব্জেক্টিভিটিরিই চর্চা তারা করে। ওয়ায়েল হাল্লাক ওরিয়েন্টালিস্টদেরকে কিছু ইঞ্জিনিয়ারের সাথে তুলনা করেছিলেন। ইঞ্জিনিয়ার প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে প্রকৃতিকে বিধবস্ত ক'রে কীভাবে সুন্দর রাস্তা বানানো যায়, সেই কোশেশ করে। কিছু মানুষ ইসলাম নিয়েও একই কাজ করে। ইসলাম নিয়ে এদের ইতিবাচকতাকে আপনি প্রশংসা করলেও তাদের তাহরিফ বা বিকৃতিকে নিয়ে প্রশ্নহীন থাকা যাবে না! তারা এমন এক আকবরীয় দীনে এলাহি তৈরি করে যাতে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দার্শনিকরা থাকে, হাওয়া থাকে,শায-চিন্তা থাকে, মুনকার-ভাবনা থাকে, উটকো দাবি থাকে, নিজ নিজ মতাদর্শের চিনি-মাখন থাকে, যারে আপনি খাইরুল কুরুনের ইসলাম বইলা চিনতে পারবেন না। তাদের মতের বিরোধীতাকারীরা বা ভিন্নমতাবলম্বীরা হয়ে ওঠে ফতোয়াবাজ, রাংবাজ, গঙ্গি আরো নানা অভিধায় ভূষিত!! অথচ এই প্রতিটি অভিধা তাদের জন্যেও খাটে। এদের মধ্যে কারো কারো ভেতরে আছে প্রচন্ড অহংবাদী মন ও প্রতিহিংসাপরায়নতা। কেউ কেউ তো প্রতিনিয়ত অন্যে যেন শারীরিক ক্ষতিকর শিকার হয়, সে-বন্দোবস্ত করতেও ইচ্ছুক এবং ফেবু-কে এক অনন্ত বিবাদের ক্ষেত্র বানাতে উদ্যোগী। অপরকে "এন্টাগোনাইজ" না ক'রে কথাই কইতে জানেনা, এমনও দেখা যায়।
Reopening muslim minds নামে মুস্তফা আকিওলের একটা বই আছে, যেখানে মুসলিমদেরকে পাশ্চাত্যের লিবারেল আইডিয়ার দিকে যাবার আলাপ আছে ৷ তো, এই বই পইড়া অভামির আঞ্জুম বললো, ভাই আপনের বই পইড়া মনে হয় অমুসলিমরাই হইলো বেস্ট মুসলিম। সেই ইসলামই ভালো ইসলাম যেইটা আপনার চাওয়া ও চিন্তার অনুগামী! ইসলামকে বিকৃত করবার যে অধিকার, সেটা তারা সগৌরবে চর্চা করে। ধরাইয়া দিলেই বলবে, একক সহীহ ইসলাম ব'লে কোন ইসলাম নাই! মোল্লাদের ইসলাম কেতাবি ইসলাম,"দ্বীনুল হাওয়া"ই হচ্ছে প্রকৃত ইসলাম!!!
ইসলামের সমস্ত মৌলিক বিষয়গুলোকে এরা ভিন্ন ব্যাখ্যা করবে। এদের কাছে জি/হা/দ হয়ে যাবে শ্রেণী সংগ্রাম,আখিরাত হবে জাগতিক অনাগত ভবিষ্যত,বা, মৃত্যু পরবর্তী জীবন মানে, মৃত্যুর পর মানুষের স্মৃতি ও শ্রুতিতে বেঁচে থাকা, নাজাত হবে ইহলোকের মুক্তি বা কমিউনিস্ট রেভ্যুলেশন। যখন এরা "আল্লহু আকবর" বলবে তখন এর মানে মানুষের সম্মিলিত শক্তির জয়গান গাওয়া। "আল্লাহ" মানে এমন এক গায়েব বা মানুষের সম্ভাবনা যাকে জাহের করতে হবে কিন্তু যেটা এখনো অধরা আছে। বেহেস্ত-দোযখ আখিরাতের বিষয় নয় এদের কাছে অর্থাৎ মৃত্যুপরবর্তী ও বিচারোত্তর কিছু নয়। বরং, দোযখ মানে, ইহকালের যুলুম। বেহেস্ত মানে এই জগতেই স্বাধীনতা,সাম্য,সুখ-শান্তি ইত্যাদি কায়েম করা। নবি মানে, এই জগতকে ব্যাখ্যা করেন ও সমকালের সমস্যার সমাধান দেন যারা,তাঁরা । এই কালে কবি-দার্শনিকরাই নবি তাদের কাছে। ইসলামের সব কনসেপ্টকে তারা "জাগতিক" করে। সুকৌশলে ঐশিতাকে অস্বীকার করেন তারা। খুব স্মার্ট সেকুলারিস্ট এনারা। উইলিয়াম ব্লেকের " man is a divine concrete and God is a human abstract " এই কথাটি, কিছু ভাষ্য-সমতে, এদেরও । এরা ফিলোসোফি আর থিয়োলোজিকে আলাদা ক'রে ফিলোসোফিকে থিয়োলোজি যাচাইয়ের দায়িত্ব দেয় ; এরা যখন ধর্ম করে তখন তাঁরা দর্শনই করে বা করতে চায়! স্পিরিচুয়ালিটি বা আধ্যাত্মিকতা বা রুহানিয়াত তাদের প্রিয় শব্দ। আনুষ্ঠানিক ইবাদত ও আযকারমুক্ত এক দিলখুশ বা মাথাখুশ স্পিরিচুয়ালিটির দিকে ঝোঁক তাদের। কেতাবের নির্দেশনায় গড়ে উঠা তাসাউফে তাদের অনাগ্রহ, তারা মাদারিজুস সালেকিন পড়বেনা। সাহাবাদের সুস্পষ্ট কওল ও তাঁদের জীবন-অভিজ্ঞান তাদের পেডানটিক মনকে টানবেনা।
এরা ইসলামের সব পরিভাষাই ব্যবহার করবে, আমাদের ভালো লাগে এটা ; কিন্তু দেখবেন প্রতিটি পরিভাষাই এদের মসিলিপ্ত! সুতরাং মুমিন এদের ইসলামবিমুক্ত ইসলাম থেকে দূরে থাকে। তবে জগত বিষয়ে এদের বয়ান থেকে উপকৃত হতে বাধা নাই,তা-ও হতে হবে সতর্কতার সাথে।
প্রয়োজনীয় পরিমাণ টেক্সট পড়া নাই বলে অনেক তরুণ এদের জ্ঞানে মোহমুগ্ধ। একটু খাটলেই এই মোহমুক্তি সম্ভব এবং এটা উপকারী। [ ২৬ অক্টোবর, ২০২২]
লেখক
মো. জগলুল আসাদ
শেয়ার করুন
বিভাগ: ইসলাম ও মুসলিম
© ২০২৬ পর্যবেক্ষণ
