ইসলাম ও মুসলিম ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ⏱ ৬ মিনিট পড়া

আবুল আ’লা মাওদূদীর রাষ্ট্রচিন্তা: জিজিয়া, জাতীয়তাবাদ ও ডিকলোনিয়াল পলিটিকাল থিওরি

প্রকাশক — পর্যবেক্ষণ
আবুল আ’লা মাওদূদীর রাষ্ট্রচিন্তা: জিজিয়া, জাতীয়তাবাদ ও ডিকলোনিয়াল পলিটিকাল থিওরি



হুমেইরা ইক্তিদার তাঁর "Jizya against Nationalism: Abul A‘la Maududi’s Attempt at Decolonizing Political Theory" প্রবন্ধে আবুল আ’লা মাওদূদীকে থিয়োলোজিয়ান হিসেবে না দেখে ডিকোলোনিয়াল পলিটিকাল থিংকার হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। মাওদূদী মূলত রাষ্ট্রতাত্ত্বিক। অন্যদের সাথে তাঁর পার্থক্য এই জায়গায় যে, পশ্চিমা রাষ্ট্রচিন্তার সাথে ক্রিটিকালি এনগেজড হয়ে রাষ্ট্রতত্ত্ব নির্মাণে তিনি ইসলামিক রিসোর্স ব্যবহার করেছেন। ইসলামের নানা বিধিবিধানকে তিনি তাঁর রাষ্ট্রকল্পনার ভেতর দিয়ে ব্যাখ্যা করেন।

মাওদূদীর তৈরি করা একটা বিশেষ শব্দ হলো মিজাজ-সিনাস-ই-রাসুল। এটি দ্বারা সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয় যিনি কোরআন-সুন্নাহ ও ফিকহের এমন সমঝ অর্জন করবেন, যাঁর বদৌলতে তিনি বুঝবেন—রাসুল (সা.) বেঁচে থাকলে এই পরিস্থিতিতে এই কাজ করতেন বা বলতেন। এভাবে যেকোনো পরিস্থিতিতে ইসলামের ভাষ্য কী হবে, সেটা মুজতাহিদ লেভেলের এই আলিম কিতাব ও সুন্নাহর আলোকে বুঝে যাবেন।

যাহোক, পশ্চিমা রাষ্ট্রতত্ত্বের একাধিপত্য মাওদূদী মেনে নেননি। এই ক্ষেত্রে তাঁর জন্যে সহায়ক হয়েছে ইসলামের ভাবসম্পদ—ইসলামের ঐতিহাসিক, তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক নানা অনুষঙ্গ। পশ্চিমা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রচিন্তার জেহনি গুলামী বা বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (intellectual slavery)-এর বাইরে এসে রাষ্ট্র, সার্বভৌমত্ব, চিন্তা, স্বাধীনতা, মাইনোরিটি কোশ্চেন, নাগরিকতা ও আনুগত্যের প্রশ্ন ইত্যাদি নিয়ে বেশ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন তিনি।

লিবারেল ও সোশালিস্ট রাষ্ট্রচিন্তার বিপরীতে বা প্রতিক্রিয়ায় তিনি ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তা হাজির করেছেন। সোশালিজম, লিবারেলিজমের মতোই ইসলাম তাঁর কাছে একটি মতাদর্শ, দর্শন ও জীবনব্যবস্থা। শুধু পার্থক্য এই যে এটি খোদাপ্রদত্ত এবং খোদার সার্বভৌমত্বের (হাকিমিয়্যাহ) উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। মাওদূদীর চিন্তাকে পশ্চিমা লিবারেল রাষ্ট্রচিন্তার ক্রিটিক হিসেবেও পাঠ করা যাবে।

তবে একটি মজার প্যারাডক্স হচ্ছে—তাঁর তত্ত্ব একই সাথে পশ্চিমা রাষ্ট্রতত্ত্বকে কন্টেস্ট করে যেমন, তেমনই তাকে কনফার্মও করে। কারণ, আধুনিক “রাষ্ট্র”-এর ধারণাটা মূলত পশ্চিমাই, আর “রাষ্ট্রের লেন্স” দিয়ে দেখা একটি পশ্চিমা পদ্ধতিই। খেলাফতের পতনের পর এবং উপনিবেশোত্তর কালে যে রাষ্ট্রসমূহ তৈরি হয় সেগুলো জাতিরাষ্ট্রিক কাঠামো ব্যবহার করেই বিকাশমান। এমনকি, অনেক তাত্ত্বিক এমনও বলে থাকেন—খেলাফত ব্যবস্থাও তৎকালীন “সাম্রাজ্য”-এর কাঠামোই ব্যবহার করে সেটার কিছুটা “ইসলামীকরণ” করেছে। সুতরাং, জাতিরাষ্ট্রের কাঠামো ব্যবহার করা অনৈসলামিক কোনো ব্যাপার নয়, যদিও এই কাঠামো “মডার্ন” কাঠামোই।

মাওদূদীর রাষ্ট্রচিন্তার একটা দিক বোঝা যায় মুরতাদের শাস্তি সংক্রান্ত তাঁর ভাবনায়। ইসলামে মুরতাদের ধারণা, অর্থাৎ ইসলাম ত্যাগের শাস্তি সংক্রান্ত ধারণাকে মাওদূদী রাষ্ট্রের লেন্স দিয়ে দেখেছেন। যে রাষ্ট্রের ভিত্তি-আদর্শ ইসলাম, সেই রাষ্ট্রে কোনো নাগরিক যদি ইসলাম ত্যাগ করে তবে সেটি স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা। তিনি এটাকে থিয়োলোজিকাল ব্যাপার যত না, তার চেয়ে বেশি রাষ্ট্রিক ব্যাপার হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ইরতিদাদ বা ইসলাম-ত্যাগকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা আসলে একধরনের আধুনিকতাবাদী চিন্তা।

ইসলামিস্টরা এন্টি-মডার্ন নয়; কলোনিয়াল মডার্নিটির বিপরীতে আধুনিকতার বিকল্প প্রস্তাব আছে তাদের। তালাল আসাদ, শাদি হামদি, অলিভার রয়, ইরফান আহমেদ, হুমেইরা ইক্তিদারদের ভাবনা এমনই। চার্লস টেলর, এমনকি তহা আব্দুর রহমানও মাল্টিপল মডার্নিটির ধারণা পোষণ করেন। আব্দুর রহমান তহা তো আধুনিকতার স্পিরিট ও আধুনিকতার এপ্লিকেশন—এই দুটো ব্যাপারকে আলাদা করেন। তাঁর মতে, আধুনিকতার যে চেতনা, সেটির পশ্চিমা এপ্লিকেশন জগতের জন্যে ক্ষতিকর হয়েছে। কিন্তু আধুনিকতার স্পিরিটের ইসলামিক এপ্লিকেশন অনেক বেশি কল্যাণকর ও টেকসই মানবতার জন্যে। আধুনিকতার স্পিরিট ও আধুনিকতার এপ্লিকেশন—এইভাবে পার্থক্য করাকে অবশ্য ওয়ায়েল হাল্লাক সমস্যায়িত করেছেন।

হুমেইরা ইক্তিদার আল্লামা মাওদূদীর জিজিয়া সংক্রান্ত আলোচনাকে ডিকলোনাইজেশন প্রজেক্ট-এর বৃহত্তর বর্গের অন্তর্ভুক্ত করে আলোচনা করেছেন। রাজনৈতিক চিন্তার ইউরোসেন্ট্রিজম ও কলোনিয়াল লিগাসিকে দেখিয়ে দেওয়া, প্রশ্ন করা এবং অইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তাকে পরখ করে বোঝা—ইক্তিদারের অন্যতম তাত্ত্বিক লক্ষ্য। তাই তিনি আবুল আ’লা মাওদূদীর জিজিয়ার বিশ্লেষণ ও জাভেদ আহমেদ গামিদির টলারেন্স বা সহনশীলতার আলাপকে পশ্চিমা লিবারেলিজমের সাথে তুল্যমূল্য করে আলাপ পাড়েন তাঁর দুটো বিখ্যাত আর্টিকেলে। একটির নাম "Jizya against Nationalism: Abul A‘la Maududi’s Attempt at Decolonizing Political Theory" এবং অপরটি "Is Tolerance Liberal? Javed Ahmad Ghamidi and the Non-Muslim Minority"।

মাওলানা মাওদূদী পশ্চিমা পলিটিকাল ক্যাটেগরিগুলোর সাথে বিচারমূলকভাবে সম্পৃক্ত হয়ে একধরনের থিয়োডেমোক্রেসির ধারণা প্রবর্তন করেছেন। তিনি পশ্চিমা রাষ্ট্রদর্শনে অহোরহ আলোচিত বর্গসমূহ—যেমন সার্বভৌমত্ব, আইন, জাতীয়তাবাদ, সংবিধান, সেকুলারিজম ইত্যাদিকে ইসলামী চিন্তাকাঠামো দিয়ে বিচার করেছেন। আবার, ইউরোপীয় লিবারেলিজম বা লিবারেল ডেমোক্রেসির প্রপঞ্চসমূহ—যেমন ইকুয়ালিটি, ইউনিভার্সাল রাইটস, মাইনোরিটি রাইটস—এর পাশাপাশি জারি থেকেছে ঔপনিবেশবাদ, বর্ণবাদ ও নানা কিসিমের বৈষম্য।

ইকুয়ালিটি ও সার্বজনীন মানবাধিকারের ধারণা পশ্চিমারা কখনোই তাদের উপনিবেশের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেনি। ইসলামী রাষ্ট্র ধর্মীয় মাইনোরিটির সাথে এমন কোনো কৃত্রিম সমতার ভান করে না। ইসলামি রাষ্ট্র ধর্মীয় মাইনোরিটিকে বিশেষভাবে ডিল করে। হুমেইরা ইক্তিদার আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বের ভাষায় মাওদূদীর ইন্টারভেনশনকে ব্যাখ্যা করেছেন। মুসলিমরা জাকাত দেয়, আর অমুসলিমরা জিজিয়া দেয়। ইসলামী রাষ্ট্রে মুসলিম ও অমুসলিমদের আনুগত্যের ধরণ ভিন্ন, কিন্তু তাদের সবার জন্যই মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি থাকবে। ইসলামি রাষ্ট্রের জিহাদের ডাকে সাড়া দেওয়া মুসলিমদের জন্য আবশ্যিক, কিন্তু “দিম্মি”দেরকে এ দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

জিজিয়া একটি নেগোশিয়েটেড প্যাক্ট। মুসলিম-অমুসলিম সবাইকে নিয়ে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী গঠিত হবে ইসলামি রাষ্ট্রে। জাকাতের বিপরীতে জিজিয়া অমুসলিমদের জন্যে একটি সিভিক ডিউটি বা সিভিক কন্ট্রিবিউশন। জিজিয়া কোনো বাড়তি চাপ বা শাস্তিও নয়, কিংবা অমুসলিমদের ছোট করা নয়। মাওদূদী জিজিয়াকে ইসলামি রাষ্ট্রে তাদের নাগরিক দায়িত্ব ও চুক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

এভাবে লিবারেলিজম ও ন্যাশনালিজমের বাইরে গিয়ে ইসলামী ভাবসম্পদ ব্যবহার করে মাওদূদী ইসলামী রাষ্ট্রের পলিটির ডিকলোনাইজড ব্যাখ্যা হাজির করেন। পশ্চিম লিবারেলিজমকে একটি ইউনিভার্সাল ক্যাটেগরি আকারে হাজির করে। মাওদূদী দেখাবেন, পশ্চিমা রাষ্ট্রতত্ত্বের ইকুয়ালিটির ধারণা যদি অকার্যকর হয়ে থাকে, যদি সেটা উপনিবেশিক অধস্তনতাকে স্বাভাবিক করে থাকে, তবে এই “ইকুয়ালিটি”-এর ধারণাকে সর্বোত্তম সার্বজনীন বর্গ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

ইনইকুয়ালিটিকে লিবারেল রাষ্ট্রতত্ত্ব নেতিবাচক হিসেবে দেখে, কিন্তু মাওদূদী এটাকে ন্যায়েরই এক ভিন্ন রকম তত্ত্ব হিসেবে ব্যাখ্যা করেন—যেখানে একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর দুটো অংশের ভেতরে আনুগত্যের ভিন্ন ভিন্ন ভিত্তি থাকে, কিন্তু নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্বাধীনতা সবার জন্যই নিশ্চিত করা হয়।

মাওদূদী দেখান যে আধুনিক রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্যাটেগরিকে ইসলামের ভাবসম্পদ ব্যবহার করে রিথিংক করা যায়। হুমেইরা ইক্তিদার জিজিয়ার পক্ষে বা বিপক্ষে কিছু বলেননি; বরং তিনি কলোনিয়াল মডার্নিটির ফাঁকফোঁকর দেখিয়ে মাওদূদী কীভাবে “ইসলামী রাষ্ট্র”-এর রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী গঠনের প্রক্রিয়া আলোচনা করেন, সেটির দিকে নজর দেন।

লেখক: জগলুল আসাদ

শেয়ার করুন
Facebook X WhatsApp Telegram LinkedIn
QR কোড স্ক্যান করে পড়ুন
বিভাগ: ইসলাম ও মুসলিম © ২০২৬ পর্যবেক্ষণ

মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

একই বিভাগের অন্যান্য লেখা

লিবারেল মুখোশের আড়ালে জামায়াত: কেন ভয়টা থেকেই যায়
ইসলাম ও মুসলিম

লিবারেল মুখোশের আড়ালে জামায়াত: কেন ভয়টা থেকেই যায়

??ামায়াতকে আমি ভয় পাই—এই কথাটা কখনও ভয়ে বলি না। ভয়টা হলো, জামায়াত যত ক্ষমতাবান হবে, তত বেশি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়বে। এবং এই…

পর্যবেক্ষণ ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
যে সাফাই জামায়াতকে বাঁচায়, কিন্তু ইসলাহকে মেরে ফেলে
ইসলাম ও মুসলিম

যে সাফাই জামায়াতকে বাঁচায়, কিন্তু ইসলাহকে মেরে ফেলে

??ই মুহূর্তে জামায়াতের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল ভেতর থেকে গড়ে ওঠা কিংবা বাইরে থেকে যাওয়া একদল প্রজ্ঞাবান, ন্যায়নিষ্ঠ ও আদর্শে অবিচল উলামা…

পর্যবেক্ষণ ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
কৌশলের নামে গণতন্ত্রের ফাঁদে ইসলামপন্থীরা
ইসলাম ও মুসলিম

কৌশলের নামে গণতন্ত্রের ফাঁদে ইসলামপন্থীরা

??ুয়াড়িদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে: “The house always wins।” শেষ পর্যন্ত ক্যাসিনোই (জুয়াঘর) জিতবে। কিন্তু এই প্রচলন এবং আরও অনেক…

পর্যবেক্ষণ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
↑