আধুনিক রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ফিকাহ: প্রয়োগ ও চ্যালেঞ্জ
ইসলাম অনড় কোনো ব্যাপার নয়। ইসলাম পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে কীভাবে এনগেজ হয়, সেটার বাস্তব নজির ইতিহাসে ও তাত্ত্বিক ফ্রেইমওয়ার্ক ফিকহে ভুরি ভুরি আছে। পরিবর্তিত বা নতুন পরিস্থিতিতে ইসলাম কীভাবে ফাংশন করবে, সেটা নিয়ে ফিকহি আলোচনা বেশ প্রসিদ্ধ। ফিকহুস সিয়াসত (রাজনৈতিক ফিকাহ), ফিকহুল ওয়াকি (বাস্তবতার ফিকাহ), ফিকহুল আওলাইয়া (অগ্রাধিকারের ফিকাহ) বা মাকাসিদুস শারিয়াহ ইত্যাদি নানা নামে এগুলোকে ডাকা হয়। এগুলো কুরআন–সুন্নাহর নীতি–নির্দেশনা ও তিন প্রজন্মের মধ্যে এগুলোর প্রয়োগ, ইজতিহাদ বা চিন্তাভাবনা, সাদৃশ্যবিচার, মাসলাহাত বা সামষ্টিক কল্যাণ, ফিতনা দুরীকরণ ইত্যাদি নানা বিবেচনার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে।
যেমন, ইসলামে শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা নিষেধ। কিন্তু আবার বিদ্রোহ করে বিজয়ী হয়ে নতুন শাসক এলে তার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা আছে। একসময় যেটা বেঠিক, পরবর্তী সময়ে সেটাকে লেজিটিমেসি দেওয়ার পেছনের কারণ হলো ফিতনা প্রতিরোধ। ইসলাম একটি শান্তিময় ও স্থিতিশীল সামাজিক পরিস্থিতি চায়। ইসলামী সিয়াসাহ সর্বদা মাসলাহাত বা জনকল্যাণকে গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে। ইসলাম সাধারণত পরামর্শভিত্তিক শাসনপদ্ধতির কথা বলে। কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি বংশীয় ও "খারাপ" শাসনকেও সুদীর্ঘকাল মেনে নেওয়া ও সহ্য করা হয়েছে। বিভিন্ন খলিফা বিভিন্নভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। প্রতিটি যুগ তার টেম্পারামেন্ট অনুযায়ী ভিন্ন শাসনপদ্ধতি বেছে নিতে পারে। ইবনে তাইমিয়া তো এক রাত নেতা ছাড়া থাকার চেয়ে ষাট বছর অপছন্দনীয় শাসকের অধীনে থাকাকে উত্তম বলেছেন। এর মানে হলো, নেতা না থাকলে ফিতনা হয়, ঐক্য–শৃঙ্খলা নষ্ট হয়, যেটা খারাপ শাসক থাকবার চেয়েও খারাপ। বড় ক্ষতি থেকে বাঁচবার জন্য ছোট ক্ষতিকে মেনে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ভবিষ্যতের কল্যাণের জন্য বর্তমানের ছোটখাটো ত্রুটিকেও অগ্রাহ্য করা হয়।
আবার, ইসলামের প্রায় সব ইবাদতের মধ্যেই প্রশস্ততা রাখা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই ইসলামে কঠোর আইন আছে; তবে নানা জাগতিক ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির শর্তে শিথিল করবার ব্যবস্থাও আছে। সবার দৃষ্টিতে কোনো কাজ জাগতিক ও উদারনৈতিক মনে হলেও শুধুমাত্র নিয়তের কারণে সেটা ইসলামে "ইসলামিক" বলে গৃহীত হয়ে যেতে পারে। নিয়ত ও তাওবা এই দুটো বিষয় দৃশ্যমান নয়, কিন্তু এই দুটো একজন মানুষ ও তার কাজকে আরেকজন থেকে আলাদা করে দেয়। ক্ষমতাপ্রাপ্তিকে কেউ যদি আল্লাহর দেওয়া আমানত মনে করে আর অন্য কেউ যদি সেটিকে নিজের ইগো ও সম্মান–প্রতিপত্তি বাড়াবার উপায় মনে করে—ইসলামি দৃষ্টিতে এ দুজন আলাদা বিবেচিত হবে, দেখতে একই হলেও।
ইসলাম নানা বিষয়ে অনেক রুখসত দিয়েছে। আবার সেই রুখসতকে যেন প্রাত্যহিক নীতি বানিয়ে ফেলা না হয়, সে ব্যাপারেও সতর্ক করেছে। ফিকহে যে কাজা নামাজ, কসর নামাজ ইত্যাদি প্রসঙ্গ আলোচিত হয়, সেটিও বাস্তবতার সাথে এক ধরনের এনগেজমেন্ট। উসূলবিদেরা যে নবির আদত ও ইবাদতকে আলাদা করেন, তার মানেও হলো—ইসলামের বিধিবিধানের সাথে বস্তুগত বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখেই আলোচনা করা। ইসলাম যেমন বাস্তবতাকে তার নিজের রঙ ও নীতি অনুযায়ী রূপান্তর করতে চায়, তেমনি বাস্তবতার অনেকটুকুকেই মেনে নেয়, বিবেচনা করে। ইসলাম তাকওয়া ও কঠোরতাকে চাপিয়ে দেয় না, বরং দুটো অনুমোদিত বিষয়ের মধ্যে সহজটাই গ্রহণ করতে বলে। তবে এটাও বলে দেয়—কোনো কিছুর ব্যাপারে শুবহা বা সন্দেহ দেখা দিলে সেটি বর্জন করা তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।
আবার, দুনিয়ার বিভিন্ন বিষয়ে ফিকহের এই নীতি—সবই হালাল বা অনুমোদিত, শুধু সেটি ছাড়া যেটি হারাম ঘোষণা করা হয়েছে—এটা ইসলামকে প্রশস্ততা দিয়েছে। ইসলামের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক না হলে উরফ বা প্রচলিত জিনিসকে গ্রহণ করার ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। অন্যদিকে, কোনো কিছু অনাগত বিপদের সম্ভাবনা রাখলে সেটিকে গোড়াতেই নিষিদ্ধ করার বিষয়ও ইসলামী ফিকহে রয়েছে, যাকে সাদ্দুজ-জারাই বলা হয়—মানে দরজাটাই বন্ধ করে দেওয়া।
এছাড়া, ইফতিরাক ও ইখতিলাফের মধ্যেও পার্থক্য করা হয়েছে। ইখতিলাফ স্বাভাবিক, কিন্তু সেটার জের ধরে ইফতিরাক বা নিজেদের মধ্যে বিভক্তি না আনার কথা বলা হয়েছে। ভিন্নতা থাকুক, বিভক্তি না আসুক। আবার ভিন্ন দল হলেও তাদেরকে বেপরোয়াভাবে তাকফির না করা, বরং তাওবার মাধ্যমে ফিরে আসার পথ রাখা ইত্যাদি প্রশস্ততা লক্ষণীয়। সমস্ত মানুষকে এক উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত ভাবা ইসলামী চিন্তার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। সবাই হয় উম্মতে ইজাবাহ, নাহয় উম্মতে দাওয়াহর অন্তর্ভুক্ত।
আবার ধরুন, মদিনা সনদ—এটিও ইসলামের প্র্যাগমেটিজমের একটি দিক। যদিও মদিনা সনদ ছিল সাময়িক ও প্রতিরক্ষামূলক, তারপরও এটি একটি নজির যে কীভাবে বাস্তব পরিস্থিতির সাথে ডিল করতে হয়। হুদাইবিয়া সন্ধিও এমনই অস্থায়ী চুক্তি ছিল, যেখানে একটি ধারা ছিল—কেউ মুসলিম হয়ে নবির (সা.) কাছে এলে তাকে মক্কায় ফেরত পাঠাতে হবে। এই ধরনের নানা প্যাক্ট পর্যালোচনা করে ইসলামের রাজনৈতিক ও বাস্তবতার ফিকহ জন্ম নিয়েছে—আপদকালীন পরিস্থিতিতে নানা ছাড় ও সমঝোতার শর্ত ও পরিস্থিতিকে আমলে নেওয়ার ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করার মধ্য দিয়ে।
আধুনিক রাষ্ট্রে বসবাস ও রাজনৈতিক তৎপরতার রূপ অন্বেষণে ইমাম গাজ্জালি, তাহির ইবনে আশুর, ইউসুফ আল-কারযাবির হাতে বিকাশিত হওয়া মাকাসিদুশ শারিয়াহকে কাজে লাগানো হয়। যদিও এই শাখার নানা অপব্যবহারের উদাহরণ ও সম্ভাবনার কথাও আলিমগণ নজরে আনেন। রাজনৈতিক ফিকাহ বা ফিকহুস সিয়াসত এবং ফিকহুল ওয়াকিকে ব্যাপকভাবে তত্ত্বায়িত ও ব্যবহার করেছেন ড. ইউসুফ আল-কারযাবি। ট্র্যাডিশনাল আলিমগণ তার বিরুদ্ধে মুরজিয়াত, অতি উদারতা ও বিচ্যুতির অভিযোগ আনলেও, ইসলামি রাজনীতি করা মানুষজন, স্বাধীনচেতা তরুণ, বাস্তবতার চাপে পিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়।
১ম পর্ব
লেখক: জগলুল আসাদ
