বিবিধ ১ মার্চ ২০২৫ ⏱ ৫ মিনিট পড়া

বাংলাদেশের রাজনীতির হালচাল

প্রকাশক — পর্যবেক্ষণ
বাংলাদেশের রাজনীতির হালচাল





বাংলাদেশে বিএনপির রাজনীতি ও জামায়াতের রাজনীতির ভালো পরিমাণ খাওয়া আছে। মানে মার্কেট আছে। আবেদন আছে। প্রাসঙ্গিকতা আছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, বিএনপি ও জামায়াত নিজেদের রাজনীতিটা নিজেরা করতে পারছে না।


প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। শূন্যস্থান ভরাট হবেই। বিএনপি ও জামায়াত যদি মনে করে যে, তারা অনন্তযৌবনা; তাহলে তাদের সে ধারণা মস্ত বড়ো ভুল। অনন্তযৌবনা কোনোকিছু হয় না। সবকিছুর বার্ধক্য এমনকি বিলুপ্তিও আছে। আর সেই বিলুপ্তি বা মৃত্যুর পর কারও জায়গাজমি বা ঘরবাড়ি খালি থাকে না। হয় তার উত্তরাধিকাররা সেটা বুঝে নেয়, নাহয় কোনো ক্রেতা সেটাকে কিনে নেয়। তারপর তারা তাদের মতো করে সেটাকে পুনর্গঠন করে, নতুনভাবে সাজিয়ে নেয়।


বিএনপির রাজনীতিটা আসলে কী? বিএনপির রাজনীতি হলো—বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের মূল্যবোধের প্রতি প্রকাশ্য শ্রদ্ধা, সব শ্রেণি ও ধর্মের মানুষকে ধারণ করা, সুশাসনের কমিটমেন্ট এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ ঠেকানো। বলা যায়, বৃটিশ পিরিয়ডের শেষদিকে ‍মুসলিম লীগের যে রাজনীতিটা ছিল, সেটাই বিএনপির রাজনীতি অনেকটা।


কিন্তু বিএনপি কী রাজনীতিটা বর্তমানে করছে? ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী কোনো শক্ত অবস্থান বিএনপি দেখাতে পারছে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের অনেক বড়ো বড়ো নেতা ভারতীয় লবি মেইনটেইন করছেন, নতজানুতা প্রদর্শন করছেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার সংস্কৃতিকে ধারণ, সুশাসনের কমিটমেন্ট ইত্যাদি নিজেদের রাজনীতির মৌলিক ভিত্তিগুলোকে বিএনপি ধরে রাখতে পারছে না। ফলে বিএনপির যে রাজনীতি বাংলাদেশে, সেখানে একটা শূন্যস্থান ক্রমাগত তৈরি হচ্ছে। 


বিএনপির রাজনীতির সেই শুন্যস্থানটা ধরার সমূহ সুযোগ ছিল জাতীয় নাগরিক পার্টির। কিন্তু তারাও খুব একটা সম্ভাবনা জাগাতে পারছে না শুরুতেই বিভিন্ন বিতর্কে পড়ে গিয়ে। একই সম্ভাবনা ছিল এবি পার্টির। কিন্তু এবি পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান মহোদয় ‘জামায়াত জামায়াত’ জিকির করতে করতে নিজেদের সম্ভাবনা নিজেই নষ্ট করেছেন। একই সম্ভাবনা আছে জুনায়েদ-রিফাতদের উদ্যোগের। জানাপের সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যায়নি। তারা যদি আসলেই রাজনীতিতে অবস্থান তৈরি করতে চায়, তাহলে তাদের উচিত বিএনপির শূন্যস্থান পূরণ করতে কী কী করা প্রয়োজন সেটা করা। বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনকে আত্মস্থ করা। সাবেক মুসলিম লীগকেও পাঠ করা। এককথায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের প্রতি শ্রদ্ধা, ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী ও বাংলাদেশবাদী রাজনীতির খাওয়া এদেশে সবচেয়ে বেশি আছে। সেই খাওয়াটা কে সবচেয়ে ভালোভাবে খেতে পারবে, সেটাই দেখার বিষয়।


জামায়াতের রাজনীতিটা কী? জামায়াতের রাজনীতি হচ্ছে—ইসলামী রাষ্ট্রদর্শন, সৎলোকের শাসন, ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধিতা ও আখিরাতে সুফল লাভের কনসেপ্ট। 


কিন্তু জামায়াত করছে কী? জামায়াত তার রাজনীতির এই মূল পিলারগুলোকেই সবচেয়ে বেশি আঘাত করে যাচ্ছে ক্রমাগত। দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে—যে যত বড়ো নেতা, সে তত বড়ো আঘাত করে চলেছেন। শীর্ষ নেতারাই ইসলামী রাষ্ট্রধারণা নিয়ে কথা বলছেন না; খুব সারতে না পারলে অনাগ্রহের সাথে বলছেন মাঝেমধ্যে। সৎলোকের শাসনের জায়গায় জামায়াত চূড়ান্তরকম ধাক্কা খাবে এবারের নির্বাচনে। সম্ভাবনাময় নির্বাচনী এলাকাগুলোতে বিভিন্ন অনৈতিক কাজেও যুক্ত হচ্ছে লোকজন। আর ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী ভূমিকার জায়গায় সবচেয়ে দৃঢ়তা প্রদর্শন করা উচিত ছিল যে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে, তখন জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের কারও কারও বিরুদ্ধে ভারতীয় লবি মেইনটেইনের অভিযোগ উঠেছে। সেই অভিযোগ অস্বীকার করা হচ্ছে বটে, কিন্তু সেই অস্বীকারবার্তায়ও খুব একটা জোর নেই; আত্মবিশ্বাস নেই।


ইসলামী রাষ্ট্রধারণার রাজনীতি ও ভারতীয় মুশরিকত্ববাদবিরোধী রাজনীতিরও একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাওয়া বাংলাদেশে আছে। সেটার প্রমাণ হচ্ছে—সমাজবিচ্ছিন্ন হওয়া সত্ত্বেও, কোনো সাংগঠনিক স্ট্রাকচার না থাকা সত্ত্বেও আসিফ আদনান গ্রুপের জনপ্রিয়তা। তরুণদের মধ্যে তাদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফ্যান-ফলোয়ার গড়ে উঠার কারণ কী? কারণ একটাই। জামায়াত তাদের মূল রাজনৈতিক ভিত্তি ‘ইসলামী রাষ্ট্র’-এর কথা না বলার কারণে আসিফ আদনানরা কিছুটা হলেও সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে—তাদের চরম চিন্তার কারণেই তারা বিকল্প জামায়াত হয়ে উঠতে পারবে না সমাজে। তারা কখনও সমাজের হয়ে উঠার কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখছি না; তরুণদের কল্পনা পর্যন্তই তাদের বিচরণ সীমাবদ্ধ থাকার সমূহ সম্ভাবনা।


তাহলে কি জামায়াতের রাজনীতির শূন্যস্থানটা খালি পড়ে থাকবে? আমার মনে হয়, খালি থাকবে না। বিএনপির রাজনীতির জায়গাটা বড়ো হওয়ার কারণে সেই শূন্যস্থান দখল করতে ইতোমধ্যে মাঠে এসেছে তিন-চারটা নতুন দল। আরও আসবে। এর পর একসময় জামায়াত যখন তার নিজের রাজনীতিটা থেকে আরও দূরে সরে আসবে ক্রমাগত, তখন জামায়াতের শূন্যস্থান দখল করতেও কোনো না কোনো দল চলে আসবে মাঠে। একাধিক দলও আসতে পারে। 


দেখা যাক, অনাগত দিনে কী হয়। তবে আবার বলছি, বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতির খাওয়া আছে বাংলাদেশে। কিন্তু নিজেদের খাওয়াটা তারা নিজেদের মুখে তুলতে পারছে না। নিজের ঘরের রান্না মজা না লেগে চাচির ঘরের রান্না মজা বেশি লাগতেছে তাদের। এর খেসারত তারা আজকেই হয়তো দেবে না। তবে খেসারতের সময়টার দৈর্ঘ্য ১৫-২০ বছরের বেশি লাগবে না বলেই ধারণা করছি। তাদেরকে নিজেদের রাজনীতিতে ফিরতেই হবে; নাহয় সাবেক মুসলিম লীগের ভাগ্যবরণ করতে হবে। পৃথিবী শুন্যস্থান পছন্দ করে না; রাজনীতির শুন্যস্থান তো মোটেও না।


লেখক

মুহাম্মদ আবু সুফিয়ান।


শেয়ার করুন
Facebook X WhatsApp Telegram LinkedIn
QR কোড স্ক্যান করে পড়ুন
বিভাগ: বিবিধ © ২০২৬ পর্যবেক্ষণ

মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

একই বিভাগের অন্যান্য লেখা

ইনকিলাব মঞ্চ কী নব্য সাহাবাগ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে?
বিবিধ

ইনকিলাব মঞ্চ কী নব্য সাহাবাগ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে?

??ারা নির্বাচনের অপেক্ষায় আছেন তাদের বলছি, ড. ইউনূসের প্রক্সি ক্রুসেডার আমল সহসাই শেষ হচ্ছে না নিশ্চিত থাকুন। অন্তত আগামী ২ বছরের মধ্যে…

পর্যবেক্ষণ ১৫ মার্চ ২০২৫
বাংলাদেশে আমেরিকা কী করতে চাইছে?
বিবিধ

বাংলাদেশে আমেরিকা কী করতে চাইছে?

?এত হাইপ তোলা ইস্যুর ভিড়ে জাতিসংঘের মহাসচিবের কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে ইফতার করার মধ্যে বড়ো দুটো বার্তা আছে। ‎ ‎প্রথম বার্তা…

পর্যবেক্ষণ ১৫ মার্চ ২০২৫
সমকামিতা ও নাগরিক পার্টি
বিবিধ

সমকামিতা ও নাগরিক পার্টি

মোনতাসির ও রুহুল আবদিন, ব্র্যাক, আসিফ সালেহ ও অন্যান্য এনজিও(The Spider Cult): Disclaimer: কিছু এক্সপ্লিসিট ছবি থাকবে, ভিডিও একটা থাকবে এবং…

পর্যবেক্ষণ ১৫ মার্চ ২০২৫
↑