বিনোদনের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে রূহানিয়াত: ঈদের আনন্দ নাকি গুনাহের নতুন সুযোগ?
বিনোদনের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে রূহানিয়াত
আমরা মুসলিম সমাজের বৈধ বিনোদন ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের সংকট নিয়ে ইদানিং অনেক কথা বলি। এই জায়গাটায় কাজ হওয়া উচিত।
কিন্তু আমি দেখছি, আমাদের আলাপ যত সংস্কৃতি আর বিনোদন নিয়ে হচ্ছে, ততই রূহানিয়াতের দাওয়াহ ও আবেদন হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের ইবাদাত কেমন যেন বিনোদন আর সাংস্কৃতি কেন্দ্রিকতায় আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। ইবাদাতের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও রূহানিয়্যাতের আবেদন বিলোপ পাচ্ছে।
এই যে রমজান বিদায় নিচ্ছে এবং ঈদ আসছে, এখানে পুরো মুসলিম সমাজের ব্যস্ততা ও আওয়াজ কোন বিষয়কে উপলক্ষ্য করে? পুরোটাই দেখবেন বিনোদন, কেনাকাটা এসবকে কেন্দ্র করে।
কিন্তু রোজা ও ঈদের কি কোন রূহানিয়্যাত নেই? সেই আওয়াজটা কি মুসলিম সমাজে প্রতিধ্বনিত হয়?
রোজার উদ্দেশ্য ছিল তাকওয়ার গুণ অর্জন করা। পুরো মাস আল্লাহ আমাদের দ্বারা তাকওয়ার চর্চা করিয়েছেন। প্রবৃত্তি চাহিদা ও দাসত্বকে বারণ করার প্র্যাক্টিস করিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের বিগত দিনসমূহের গোনাহ মাফের ব্যবস্থা করেছেন এবং রোজার পরেও গোনাহ না করার জন্য দুটি প্রধান আত্মিক শক্তির অনুশীলন করিয়েছেন। তাকওয়া ও প্রবৃত্তির দাসত্বকে প্রত্যাখ্যান। এ দুটির শূন্যতাই সমস্ত গোনাহের মূল। যে এ দুটি গুণ অর্জন করেছে, সেই জান্নাতি মানুষ হতে পেরেছে।
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَاَمَّا مَنۡ خَافَ مَقَامَ رَبِّہٖ وَنَہَی النَّفۡسَ عَنِ الۡہَوٰی فَاِنَّ الۡجَنَّۃَ ہِیَ الۡمَاۡوٰی
আর যে ব্যক্তি নিজ প্রতিপালকের সামনে দাঁড়ানোর ভয় পোষণ করত এবং নিজেকে মন্দ চাহিদা হতে বিরত রাখত, জান্নাতই হবে তার ঠিকানা। ( সুরা নাযিয়াত, আয়াত ৪০-৪১)
রমজান বিদায় নিচ্ছে, আমরা কি নিজেদের গোনাফ মাফ করাতে পেরেছি? আমরা কি রমজান পরবর্তী সময়ে গোনাহ না করার মত আত্মিক শক্তি লাভ করতে পেরেছি? তাকওয়া আর কুপ্রবৃত্তিকে প্রত্যাখ্যানের চেতনা কি আমাদের ভিতর এসেছে?
ঈদের মূল বাস্তবতাটা কি? কেন ঈদের এই আনন্দ? ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি রহিমাহুল্লাহ বলেন,
ঈদুল ফিতরের দিন সমস্ত উম্মতের জন্য ঈদ ও আনন্দের দিন হওয়ার কারণ হল- ঐ দিন আল্লাহ তাআলা রোযাদারদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। ফলে যারা গোনাহগার তারাও নেককারদের দলে শামিল হয়ে যায়।... সুতরাং ঈদের দিন যাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় তার জন্য সেদিন ঈদ ও খুশির দিন আর ঐ দিন যে মুক্তি পায়নি তার জন্য সেদিন কান্না ও বিলাপের দিন। (লাতাইফুল মাআরিফ, পৃ. ২৩৭-২৩৮)
আমাদের আরেক সালাফ বলতেন,
যাকে অঞ্জলি ভরে দান করা হল, ঈদ তো তার জন্য নয়। ঈদ তো হল ঐ ব্যক্তির জন্য, যার গুনাহ মাফ করে দেওয়া হল। (মুজামুস সাফার, আবু তাহের সিলাফী, পৃ. ৩০২)
মুসলিম সমাজে কি ঈদের এই বাস্তবতা ও রূহানিয়্যাতের উপলদ্ধি আছে? মোটেও না। প্রথমত আমরা রমজানের প্রস্থান ও ঈদের আগমনের কারণ, উদ্দেশ্য, অর্জন নিয়ে কোন হিসেবনিকেশই করি না। দ্বিতীয়ত যেই ঈদ এসেছে গোনাহ মাফের উপলক্ষ্য হিসেবে, সেই ঈদটাকেই আমরা বানিয়ে নিচ্ছি শত গোনাহের মোক্ষম উপলক্ষ্য। ফলে আমাদের ঈদ আর ঈদ থাকছে না, ওয়াঈদ হয়ে যাচ্ছে।
ঈদ আসছে। বৈধভাবে ঈদকে উৎযাপন করুন। আনন্দমুখর করে তুলুন। পাশাপাশি সিয়াম ও ঈদের যে রূহানিয়্যাত সেটার মুহাসাবাও জারি রাখুন।
লেখক
ইফতেখার সিফাত
