ইসলাম ও মুসলিম ২৪ মার্চ ২০২৫ ⏱ ৬ মিনিট পড়া

দ্বীনের বুঝ বনাম তাবলীগের বুঝ

প্রকাশক — পর্যবেক্ষণ
দ্বীনের বুঝ বনাম তাবলীগের বুঝ

 


তাবলীগে সময় লাগানো ছাড়া তাবলীগের মেহনতের সমঝ না আসার ব্যাপারটা বাস্তব। এখানে এটাই সত্য। যিনি তাবলীগের মেহনতের মধ্যে দীর্ঘ একটা সময় কাটাননি, সাথিদের সাথে আন্তরিকভাবে মেশেননি, মনের কথা আদানপ্রদান করেননি, জজবার মুহূর্তগুলো একসাথে অতিবাহিত করেননি তিনি তাবলীগের বুঝটা পূর্ণরূপে পাবেন না।


এ ধরনের একটা কথা প্রচলিত আছে। এবং কথাটা পরিপূর্ণ সত্য।

এখানে তাবলীগ বলতে একটি শরয়ী পরিভাষা নয়; বরং প্রচলিত তাবলীগ জামাতকে বোঝানো হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই মেহনতটি ভেতরে ভেতরে সেই রূপকে বদলে ফেলেছে যা তাবলীগ জামাত সম্পর্কে মানুষ নদভী রহ. এর কিতাবটি পড়ে অথবা বাহ্যিকভাবে দেখে ধারণা করে থাকে। এটা নিজে নিজে একটা স্বতন্ত্র রূপ গ্রহণ করেছে। এটি একটি স্বতন্ত্র চিন্তাকেন্দ্র।


যিনি সময় লাগাননি তিনি বুঝবেন না, এখানে ঈমানের একটি বিশেষ অর্থ আছে। যার অস্পষ্ট দিক হলো আসবাবকে অস্বীকার করা। এখানে শিক্ষা দেয়া হয়, কৃষক ধান লাগিয়ে ভাবে : আমি ধান লাগালাম, আল্লাহ ফসল দেবেন। কিন্তু এটি নাকি ভুল ধারণা। এটি ভুল হওয়ার কারণ কী তা অনেক সাথিকে প্রশ্ন করেও আমি জানতে পারিনি। কেউও ব্যাপারটা বোঝে না। অবশ্য দাওয়াত ও বয়ানে বলে।


এখানে তাওয়াক্কুল খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। দাওয়াতের কাজের জন্য পরিবারকে ছেড়ে সফরে বের হওয়ার ব্যাপারটা খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়। কেউ নিজ পরিবারের প্রয়োজন পূরণের জন্য সফরে যেতে না পারলে তাকে ছোট করে দেখা হয়। এবং সে নিজেও নিজেকে খুব খারাপ মনে করে। পরিবারের প্রয়োজন মেটানো, অসুস্থের দেখভাল সর্বদাই এখানে তাবলীগী সফর ও তাবলীগী নেজামের অনুসরণের তুলনায় অনেক নিচের দরজায় দেখা হয়। 


সালের সফরে চলনেওয়ালা তাবলীগী পরিবারের একজন আলেমের কাছে  এক সাথির কারগুজারি শুনেছিলাম। যিনি মরণাপন্ন স্ত্রীকে একা রেখে সফরে চলে যান। এরপর কীভাবে আল্লাহ তার স্ত্রী আর শিশুকে হেফাজত করেন। শরীয়ত একজন ভালো মুসলমানকে কি এই অবস্থায় নেসাবী চিল্লায় যাওয়ার অনুমতি দেয় কি না সেটা এখানে মুখ্য কখনোই না। জিন্দেগীর চূড়ান্ত সফলতা এখানে বেশির থেকে বেশি আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া। এর ফলে সমাজ, সংসার শরীয়ত কোথায় কী গেল, সেসব দেখা ঈমানের কমজোরি। 


এক সাথি শুনিয়েছিলেন : মুফতি সাহেবকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যুবতী মেয়েকে অরক্ষিত রেখে আল্লাহর রাস্তায় যাওয়ার অনুমতি আছে? মুফতি সাহেব বললেন নাজায়েয। অথচ হযরত আবু বকর রাযি. এভাবে আল্লাহর রাস্তায় গেছেন!


একটা জিনিস খুব ভালো করে বুঝতে হবে : তাবলীগ এখন স্কাইনেট। অথবা ফ্রাঙ্কেস্টাইন। এর নিজস্ব একটা সিস্টেম তৈরি হয়ে গেছে। এই সিস্টেমের অন্যতম প্রোগ্রাম হলো নিজেকে রক্ষা করা। নিজেকে বলয়ের ওপর টিকিয়ে রাখতে সব কিছু করা।


শরয়ী পরিভাষাগুলোর সে সমস্ত ব্যাখ্যা সাথিদের মন-মস্তিষ্কে, রগ-রেশায় মিশে গেছে যা দীর্ঘদিন আলেম-গায়রে আলেম তাবলীগওয়ালাদের মাধ্যমে তাঁরা শুনেছে। এবং নিজের অস্তিত্বের মাঝে মিশিয়ে নিয়েছে। 


তারা বার বার শুনেছে হাদীছে বর্ণিত একমাত্র সঠিক পথের দল তাবলীগ। শুনেছে এক এক কথায় এক এক বছরের ইবাদতের নেকি। শুনেছে এই জামানায় একমাত্র হকদল এটি। তাবলীগ আল্লাহ গুনাহগারদের দ্বারা করান না। তাদের অনুসরণ করো, যারা বিনিময় নেয় না। তার কথার চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে...। এক টাকায় সাত লক্ষ টাকা সদকা করার নেকি। প্রতিটি নেক আমলে উনপঞ্চাশ কোটি গুণ নেকি। তাবলীগওয়ালাদের হাশর নবীদের সাথে হবে। তাবলীগের মেহনত আসার পর সুলুক ও ইহসানের অন্য সকল তরিকার প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে। 


এতকিছু শোনার পর, মগজে মিশিয়ে নেওয়ার পর কেউ মেহনতের কোনো ব্যাপার বা কোনো হযরতের ওপর আপত্তি করলে সেটা মেনে নেওয়া একজন সাধারণ তাবলীগের সাথির জন্য কষ্টকর।


তাবলীগের যে স্তরের সাথিদের নিয়ে মূলত সমস্যাটা হয়, তাদের কোনোভাবেই অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করানো সম্ভব না যে একজন আলিম তাবলীগ না করেও আল্লাহর কাছে তাবলীগওয়ালা আলিমের চেয়ে বড় হতে পারে।


আমাদের এক প্রফেসর সাহেব, যিনি ৩০ বছর ধরে ‘অ্যাক্টিভ সাথি’,  শোনালেন তার পরিচিত এক সাথি আফসোসের ওপর আফসোস করছে যে তার বাবার ইন্তেকাল হয়েছে। সে নামায পড়ত, অন্যান্য আমল করত, কিন্তু তাবলীগ তো করত না। তার আখিরাতে কী অবস্থা হবে!


যে দাওয়াত দেয়নি, সে একে তো ফরযে আইন ভঙ্গ করেছে, আরেকটা হলো দাওয়াত ছাড়া যেহেতু ঈমান সহীহ হয় না, ঈমানের মধ্যেও শিরক থেকে যাবে। 


কালেমার যিকির। তোমরা বেশি বেশি কালেমাকে বলতে থাকো। মানে হলো কালেমার দাওয়াত দাও। যিকির করলে হাদীছে বর্ণিত ঈমান নবায়ন হবে না। 


ওষুধ খাওয়ার আগে ভাবতে হবে এই ওষুধের কোনো ক্ষমতা নেই। করনেওয়ালা যাত শুধু আল্লাহ। বস্তুর মধ্যে থাকা আল্লাহর দেওয়া ক্ষমতাকে অস্বীকার করা একটা নিয়মিত অনুশীলন।


হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক সাহেবকে যতবার প্রচণ্ড ক্রোধে ফেটে পড়তে দেখেছি তার একটি ছিল, এই কথা জিজ্ঞেস করার পর। 


প্রশ্ন করেছিলাম : দিল থেকে মাখলুকের ক্ষমতার তাসিরও বের করতে হবে।

হযরত জিজ্ঞেস করেছিলেন, এর মানে কী?

বললাম, আগুন পোড়াতে পারে না। পানি ডোবাতে পারে না...।


হযরত বলেছিলেন, এসব অস্বীকার মানে কুরআন-হাদীসের অস্বীকার।


এর ফিরিস্তি অনেক লম্বা।


মূল মেসেজ যেটা : বর্তমান সময়ে তাবলীগের মধ্যে শর‍য়ী প্রত্যেকটা ব্যাপারের নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। সবগুলোর বিশ্লেষণ ওলামায়ে কেরাম যদি করেন, সুতা বেছে বেছে কম্বলের কতটুকু থাকবে আল্লাহই জানেন। এই স্কাইনেট নিজে নিজে বহুদূর চলে গেছে। 


তাবলীগের মেহনতের সাথে জড়িত সাথিদের মৌলিক সমস্যা হলো ইলমী সংকীর্ণতায় থাকা। প্রশ্ন করলে শোনা যায় তাদের হায়াতুস সাহাবাই নাকি পড়া কখনো শেষ হয় না। বেচারারা আর কিছু কবে পড়বে।


সাথিরা বাইরের জগৎ সম্পর্কে বড্ড বেখেয়াল। ইসলামের খেদমতে জগতে যে আরও কত মানুষ কতভাবে কাজ করে যাচ্ছে, তাদের বেশির ভাগের ধারণাই নেই। অবশ্য জানলেও সেট আপ মাইন্ড বুঝিয়ে দেয় : নবীওয়ালা কাজ শুধু নবীওয়ালা তরিকাতে করলেই কবুল হবে।


একবার এক সাথিকে থানবী রহ. এর ‘ঈমান ও আকীদা’ কিতাবটা পড়তে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার ভাই কিছুক্ষণ পরে আমাকে বইটা ফিরিয়ে দিলেন। বললেন, আমাদের মারকাযের দেয়া ৪ কিতাবের বাইরে কিছু না পড়া উচিত। ভাই যখন বইটা ফিরিয়ে দিচ্ছিল, আমার মনে ভাসছিল, হযরতজী রহ. এর মালফুয : মেহনতের তরীকা হবে আমার আর তালীম হবে থানবী রহ. এর।


চিৎকার করে বলতে মনে চেয়েছিল : হযরতজী, দেখে যান, আপনার সাথি আমাকে থানবী রহ. এর কিতাব ফিরিয়ে দিচ্ছে।



লেখক

মুহাম্মাদ হুসাইন

শেয়ার করুন
Facebook X WhatsApp Telegram LinkedIn
QR কোড স্ক্যান করে পড়ুন
বিভাগ: ইসলাম ও মুসলিম © ২০২৬ পর্যবেক্ষণ

মন্তব্য (০)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

একই বিভাগের অন্যান্য লেখা

লিবারেল মুখোশের আড়ালে জামায়াত: কেন ভয়টা থেকেই যায়
ইসলাম ও মুসলিম

লিবারেল মুখোশের আড়ালে জামায়াত: কেন ভয়টা থেকেই যায়

??ামায়াতকে আমি ভয় পাই—এই কথাটা কখনও ভয়ে বলি না। ভয়টা হলো, জামায়াত যত ক্ষমতাবান হবে, তত বেশি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়বে। এবং এই…

পর্যবেক্ষণ ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
যে সাফাই জামায়াতকে বাঁচায়, কিন্তু ইসলাহকে মেরে ফেলে
ইসলাম ও মুসলিম

যে সাফাই জামায়াতকে বাঁচায়, কিন্তু ইসলাহকে মেরে ফেলে

??ই মুহূর্তে জামায়াতের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল ভেতর থেকে গড়ে ওঠা কিংবা বাইরে থেকে যাওয়া একদল প্রজ্ঞাবান, ন্যায়নিষ্ঠ ও আদর্শে অবিচল উলামা…

পর্যবেক্ষণ ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
কৌশলের নামে গণতন্ত্রের ফাঁদে ইসলামপন্থীরা
ইসলাম ও মুসলিম

কৌশলের নামে গণতন্ত্রের ফাঁদে ইসলামপন্থীরা

??ুয়াড়িদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে: “The house always wins।” শেষ পর্যন্ত ক্যাসিনোই (জুয়াঘর) জিতবে। কিন্তু এই প্রচলন এবং আরও অনেক…

পর্যবেক্ষণ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
↑